তমদ্দুন মজলিস বলতে কি বুঝ?

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে 'পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস'-এর মাধ্যমে। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে 'তমদ্দুন মজলিস' প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর অন্য দুজন সদস্য হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম (পরবর্তীতে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি) এবং শামসুল আলম। শুরু হয় ভাষা আন্দোলনের গোড়াপত্তন।

তমদ্দুন মজলিস বলতে কি বুঝ?
তমদ্দুন মজলিস বলতে কি বুঝ?

তমদ্দুন মজলিসঃ

'তমদ্দুন মজলিস' ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার। অধ্যাপক আবুল কাসেম ছিলেন তমদ্দুন মজলিসের মূল সংগঠক ও নেতা। তার ১৯ নং আজিমপুর রোডের বাসভবনটি ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম অফিস।

রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু। তমদ্দুন মজলিসের পক্ষে থেকে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু, শীর্ষক একটি সংকলন পুস্তক প্রকাশিত হয়। তাতে আবুল কাসেম সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ করেন- পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা ও অফিস-আদালতের ভাষা হবে বাংলা। উর্দু হবে দ্বিতীয় ভাষা ও ইংরেজি হবে তৃতীয় ভাষা। একইভাবে পশ্চিম পাকিস্তানে উর্দু প্রথম, বাংলা দ্বিতীয় ও ইংরেজি তৃতীয় ভাষা হবে।

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ: 

১৯৪৭ সালের ১ অক্টোবর, তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে 'রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' গঠিত হয়। এর আহ্বায়ক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ্যার অধ্যাপক শামসুল আলম। ঐদিনই তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে ভাষার দাবিতে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এভাবে একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে তমদ্দুন মজলিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অভিমত: 

তমদ্দুন মজলিস সম্পর্কে এর প্রাণপুরুষ অধ্যাপক আবুল কাসেম বলেন, "পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস" আদর্শবাদী কর্মীদের বৈজ্ঞানিক সংগঠন। চিন্তা বিপ্লব ও সাংস্কৃতিক উজ্জীবন মারফত সর্বমানবীয় কল্যাণধর্মী আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র কায়েমই মজলিসের লক্ষ্য ছিল।

অধ্যাপক আব্দুল গফুর বলেন, "ভাষা আন্দোলনের সূচনা পর্বে নেতৃত্ব দেয় তমদ্দুন মজলিস, যা ছিল একটি ইসলামি আদর্শবাদী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।"

অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, "পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে 'তমদ্দুন মজলিস' ছিল একটি চমকে দেওয়া বিপ্লবী নাম। ভাষা আন্দোলনের স্থপতি তমদ্দুন মজলিস এবং এর মুখপাত্র 'সৈনিক' পত্রিকার এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। এসব কিছুরই প্রাণপুরুষ ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম (বর্তমানে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম নামে সুপরিচিত)। বস্তুত প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের উনিশ নম্বর আজিমপুরের বাড়িটি ছিল ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার।"

জনাব সানাউল্লাহ নূরী বলেন, “ঢাকায় পাকিস্তানের পতাকা উঠানোর ষোলো দিন পর জন্ম হয় এই অরাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সংগঠনটির। বাংলা ভাষার পক্ষে ছাত্র, বুদ্ধিজীবী এবং জনগণের ক্ষেত্রে তমদ্দুন মজলিস পালন করেছিল এক অনন্য ভূমিকা।" সুতরাং বলা যায়, তমদ্দুন মজলিস ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়।

পরিশেষেঃ

পুরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা যায় কিনা এ নিয়ে ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী মহলে প্রথম চিন্তার সূত্রপাত করে তমদ্দুন মজলিস। এটি ছিল ইসলামি আদর্শে প্রভাবিত আধা-রাজনৈতিক এবং আধা-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। তমদ্দুন মজলিসের অফিস থেকেই ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের সব কাজের পরিকল্পনা ও পরিচালনা করা হতো। ভাষা আন্দোলনের অনেক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এ প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহীত হয়েছিল। সুতরাং বলা যায়, ভাষা আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিস পালন করেছিল এক অনন্য ভূমিকা।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url