Widget HTML #1

প্রথম স্কুলে পাঠানোর আগে শিশুকে যা শেখাবেন: ৮টি জরুরি বিষয়

বিষয়সূচি

একটি শিশুর জীবনে প্রথম স্কুলে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। এতদিন পর্যন্ত যে শিশু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পরিচিত পরিবেশে বড় হয়েছে, তাকে হঠাৎ করে নতুন মানুষ, নতুন জায়গা, নতুন নিয়ম এবং নতুন বন্ধুদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। তাই প্রথমবার স্কুলে পাঠানোর আগে শুধু বই-খাতা, পোশাক কিংবা স্কুলব্যাগ প্রস্তুত করলেই হবে না; শিশুকে কিছু প্রয়োজনীয় জীবনদক্ষতাও ধীরে ধীরে শেখানো দরকার। এতে শিশু স্কুলে গিয়ে নিজেকে নিরাপদ ও আত্মবিশ্বাসী মনে করবে এবং শিক্ষকদের নির্দেশনা সহজে বুঝতে পারবে। বাবা-মায়ের নাম, বাসার ঠিকানা, প্রয়োজনীয় ফোন নম্বর জানা থেকে শুরু করে সুন্দরভাবে কথা বলা, সালাম ও ধন্যবাদ দেওয়া, টয়লেট ব্যবহার এবং নিজের জিনিসপত্র সামলানোর মতো ছোট ছোট বিষয় শিশুর জন্য ভবিষ্যতে অনেক কাজে আসে। তাই প্রথম স্কুলে পাঠানোর আগে ভালোবাসা ও ধৈর্যের সঙ্গে নিচের বিষয়গুলো শিশুকে শেখাতে পারেন।

নোট: শিশুর জ্ঞান বৃদ্ধি সহায়ক হিসেবে আমাদের "শিশুর সাধারণ জ্ঞান প্রশ্ন ও উত্তর" পোস্টটিও পড়তে পারেন।

প্রথম স্কুলে পাঠানোর আগে শিশুকে প্রয়োজনীয় বিষয় শেখাচ্ছেন বাবা-মা
প্রথম স্কুলে পাঠানোর আগে শিশুকে প্রয়োজনীয় পরিচয়, ঠিকানা ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো শেখানো জরুরি।

১। বাবা-মায়ের নাম

প্রথম স্কুলে যাওয়ার আগে শিশুকে অবশ্যই তার বাবা ও মায়ের নাম শেখানো উচিত। অনেক সময় শিশুরা বাবা-মাকে শুধু ‘বাবা’ বা ‘মা’ বলে ডাকে। কিন্তু প্রয়োজনের সময় নিজের বাবা-মায়ের পুরো নাম বলতে পারা একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

প্রতিদিন স্বাভাবিকভাবে শিশুকে জিজ্ঞেস করতে পারেন—

“তোমার বাবার নাম কী?”
“তোমার মায়ের নাম কী?”

খেলার ছলে বারবার বললে শিশু সহজেই মনে রাখতে পারবে। একই সঙ্গে তাকে নিজের নামও পরিষ্কারভাবে বলতে শেখান।

তবে শিশুকে মুখস্থ করানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করবেন না। আনন্দের সঙ্গে গল্প, খেলা কিংবা ছোট প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে শেখালে বিষয়টি তার কাছে সহজ ও আনন্দদায়ক হবে।

২। বাসার ঠিকানা ও ফোন নাম্বার

শিশুকে তার বাসার ঠিকানা সম্পর্কে একটি সহজ ধারণা দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত বাসার এলাকা, বাড়ি বা ফ্ল্যাটের পরিচিতি এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য বয়স অনুযায়ী শেখানো যেতে পারে।

একই সঙ্গে বাবা-মায়ের অন্তত একটি ফোন নম্বর শিশুকে মনে রাখতে শেখানো ভালো। ছোট শিশুদের জন্য দীর্ঘ নম্বর মনে রাখা কঠিন হতে পারে। তাই প্রতিদিন অল্প অল্প করে অনুশীলন করাতে পারেন।

উদাহরণ হিসেবে শিশুকে জিজ্ঞেস করতে পারেন—

“আমরা কোন এলাকায় থাকি?”
“বাবার ফোন নম্বর কী?”

শিশু ভুল করলে বকা দেবেন না। বরং ধৈর্য ধরে আবার বলুন এবং কয়েক দিন পরপর তাকে মনে করিয়ে দিন।

বিশেষ করে শিশুকে বোঝাতে হবে, অপরিচিত কারও কাছে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে বাবা-মা বা পরিচিত বড়দের সাহায্য নিতে হবে।

৩। সুন্দরভাবে কথা বলা

স্কুলে গিয়ে শিশুকে শিক্ষক, সহপাঠী এবং অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাই ছোটবেলা থেকেই সুন্দর ও ভদ্রভাবে কথা বলার অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন।

শিশুকে শেখাতে পারেন—

  • কারও সঙ্গে কথা বলার সময় মনোযোগ দিয়ে শুনতে।
  • অন্যের কথা মাঝপথে না কাটতে।
  • চিৎকার না করে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে।
  • নিজের প্রয়োজন হলে ভদ্রভাবে বলতে।
  • কোনো কিছু বুঝতে না পারলে শিক্ষককে প্রশ্ন করতে।
  • অন্য শিশুকে অপমানজনক কথা না বলতে।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাবা-মায়ের নিজেদের আচরণ। শিশু সাধারণত বড়দের দেখেই অনেক কিছু শেখে। তাই পরিবারের সদস্যরা যদি পরস্পরের সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলেন, শিশুও ধীরে ধীরে সেই অভ্যাস আয়ত্ত করবে।

৪। সালাম ও ধন্যবাদ দেওয়া

শিশুর সামাজিক আচরণ ও সৌজন্যবোধ গড়ে তুলতে সালাম, ধন্যবাদ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দুঃখ প্রকাশ করার অভ্যাস শেখানো ভালো।

কেউ কোনো সাহায্য করলে শিশুকে “ধন্যবাদ” বলতে শেখান। কারও সঙ্গে দেখা হলে বয়স ও পারিবারিক সংস্কৃতি অনুযায়ী সালাম দেওয়ার অভ্যাস করানো যেতে পারে।

আবার ভুল করে কাউকে কষ্ট দিলে “দুঃখিত” বা ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাসও তৈরি করুন।

এসব বিষয়কে শুধু মুখস্থ করানোর পরিবর্তে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করতে দিন। যেমন—আপনি শিশুকে কোনো জিনিস দিলে সে যেন স্বাভাবিকভাবে ধন্যবাদ জানায়। এতে ধীরে ধীরে সৌজন্যবোধ তার আচরণের অংশ হয়ে উঠবে।

৫। টয়লেট ব্যবহারের নিয়ম

প্রথমবার স্কুলে যাওয়ার আগে শিশুকে নিজের প্রয়োজন বুঝে টয়লেট ব্যবহার করতে শেখানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলে বাবা-মা সবসময় পাশে থাকবেন না। তাই বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী শিশুকে যতটা সম্ভব স্বনির্ভর হতে সাহায্য করুন।

শিশুকে শেখাতে পারেন—

  • টয়লেটের প্রয়োজন হলে শিক্ষককে জানাতে।
  • টয়লেট ব্যবহারের আগে ও পরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে।
  • ব্যবহারের পর ফ্লাশ করতে।
  • সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে।
  • টয়লেট নোংরা না করতে।
  • কোনো সমস্যা হলে লজ্জা না পেয়ে শিক্ষক বা দায়িত্বশীল বড় কাউকে জানাতে।

শিশুকে এ বিষয়ে ভয় দেখানো উচিত নয়। বরং বোঝাতে হবে, টয়লেট ব্যবহার করা স্বাভাবিক বিষয় এবং প্রয়োজন হলে সাহায্য চাওয়া কোনো লজ্জার ব্যাপার নয়।

৬। ব্যাগ ও বইখাতা সামলানো

স্কুলে যাওয়ার পর শিশুর নিজের ব্যাগ, বই, খাতা, পেন্সিল, পানির বোতলসহ বিভিন্ন জিনিসের প্রতি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন।

প্রথম থেকেই সবকিছু বাবা-মা করে দিলে শিশু নিজের জিনিস সামলানোর অভ্যাস তৈরি করতে পারবে না। তাই বয়স অনুযায়ী ছোট ছোট দায়িত্ব শিশুকে দিন।

যেমন—

  • বই ও খাতা ব্যাগে গুছিয়ে রাখা।
  • পেন্সিল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা।
  • পানির বোতল ঠিকমতো বন্ধ করা।
  • নিজের ব্যাগ চিনতে পারা।
  • অন্যের জিনিস অনুমতি ছাড়া না নেওয়া।
  • নিজের জিনিস হারিয়ে গেলে শিক্ষককে জানানো।

প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে শিশুর সঙ্গে বসে ব্যাগ গুছানোর অভ্যাস করাতে পারেন। এতে একদিকে দায়িত্ববোধ তৈরি হবে, অন্যদিকে ধীরে ধীরে সে নিজের কাজ নিজে করতে শিখবে।

৭। ক্লাসে মনোযোগ দেওয়া

প্রথমদিকে অনেক শিশুর জন্য দীর্ঘ সময় ক্লাসে বসে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। এটি স্বাভাবিক। তাই স্কুলে যাওয়ার আগেই শিশুকে ধীরে ধীরে কিছুক্ষণ বসে গল্প শোনা, ছবি দেখা বা কোনো সহজ কাজ করার অভ্যাস করানো যেতে পারে।

শিশুকে শেখান—

  • শিক্ষক কথা বলার সময় মনোযোগ দিয়ে শুনতে।
  • নিজের জায়গায় শান্তভাবে বসতে।
  • বুঝতে না পারলে প্রশ্ন করতে।
  • অন্য বন্ধু কথা বললে তাকে বিরক্ত না করতে।
  • প্রয়োজন ছাড়া ক্লাসের মধ্যে ঘোরাঘুরি না করতে।
  • কাজ শেষ করার চেষ্টা করতে।

তবে এখানে শিশুর ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া ঠিক নয়। প্রথম দিন থেকেই দীর্ঘ সময় নিখুঁতভাবে মনোযোগী থাকবে—এমন প্রত্যাশা না রেখে ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি করতে হবে।

৮। অপেক্ষা করার ধৈর্য্য

শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই অনেক সময় দ্রুত কিছু পেতে বা নিজের কথা আগে বলতে চায়। কিন্তু স্কুলে তাকে অনেক ক্ষেত্রে নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তাই ছোটবেলা থেকেই অপেক্ষা করার অভ্যাস শেখানো দরকার।

উদাহরণ হিসেবে খেলাধুলার সময় তাকে নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করতে শেখাতে পারেন। পরিবারের সবাই মিলে কোনো খেলায় অংশ নিলে প্রত্যেকের পালা আলাদা করে দিন।

শিশুকে বোঝান—

“অন্যের পালা শেষ হলে তোমার পালা আসবে।”

এভাবে ধীরে ধীরে সে বুঝতে শিখবে যে সবকিছু সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না এবং অন্যদেরও সমান সুযোগ দিতে হয়।

অপেক্ষা করার এই ছোট্ট অভ্যাস ভবিষ্যতে শিশুর ধৈর্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক আচরণ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

শিশুকে শেখানোর সময় যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন

প্রথম স্কুলে যাওয়ার আগে শিশুকে এসব বিষয় শেখানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভালোবাসা, ধৈর্য এবং নিয়মিত অনুশীলন

একদিনে সবকিছু শেখানোর চেষ্টা করবেন না। প্রতিদিন কয়েক মিনিট করে একটি বা দুটি বিষয় অনুশীলন করান। শিশুর ভুল হলে বকা না দিয়ে আবার বুঝিয়ে বলুন।

আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার—প্রতিটি শিশুর শেখার গতি এক নয়। কোনো শিশু দ্রুত মনে রাখতে পারে, আবার কোনো শিশুর একটু বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে। তাই অন্য শিশুর সঙ্গে নিজের সন্তানকে তুলনা না করে তার নিজের অগ্রগতিকে গুরুত্ব দিন।

শিশুকে ছোট ছোট দায়িত্ব দিলে তার আত্মবিশ্বাসও বাড়বে। যেমন—নিজের জুতা ঠিক জায়গায় রাখা, ব্যাগ গুছানো, খেলনা সরিয়ে রাখা কিংবা খাবারের পর নিজের জিনিস পরিষ্কার করার মতো কাজগুলো বয়স অনুযায়ী করতে দেওয়া যেতে পারে।

শেষ কথা

প্রথম স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি শুধু নতুন পোশাক, জুতা, ব্যাগ ও বই-খাতা কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুকে নতুন পরিবেশে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলতে শেখানোও এই প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাবা-মায়ের নাম জানা, বাসার ঠিকানা ও প্রয়োজনীয় ফোন নম্বর মনে রাখা, সুন্দরভাবে কথা বলা, সালাম ও ধন্যবাদ দেওয়া, টয়লেট ব্যবহারের নিয়ম জানা, নিজের ব্যাগ ও বইখাতা সামলানো, ক্লাসে মনোযোগ দেওয়া এবং নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করার মতো ছোট ছোট অভ্যাস শিশুর স্কুলজীবনকে অনেক সহজ করে দিতে পারে।

তবে মনে রাখবেন, শিশু এখনও শেখার বয়সে আছে। তাই ভুল করলে তাকে ভয় না দেখিয়ে ভালোবাসার সঙ্গে বুঝিয়ে দিন। আপনার উৎসাহ, প্রশংসা ও সহযোগিতাই শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর সবচেয়ে বড় শক্তি। ধীরে ধীরে এসব অভ্যাস গড়ে উঠলে স্কুলে যাওয়ার নতুন অভিজ্ঞতা শিশুর কাছে আরও আনন্দময় ও সুন্দর হয়ে উঠবে।

নোট: আপনি চাইলে আমাদের অন্য আরেকটি পোস্ট "শিশুদের পারিবারিক সাধারণ জ্ঞান" এটিও দেখতে পারেন। এখানে অতি যত্নের সাথে শিশুদের শেখানোর কথা বলা হয়েছে।

FAQ

প্রশ্ন: প্রথমবার স্কুলে যাওয়ার আগে শিশুকে কী শেখানো উচিত?

উত্তর: শিশুকে নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম, বাসার ঠিকানা, প্রয়োজনীয় ফোন নম্বর, ভদ্রভাবে কথা বলা, টয়লেট ব্যবহার এবং নিজের জিনিসপত্র সামলানোর মতো বিষয় শেখানো উচিত।

প্রশ্ন: শিশুকে কতদিন আগে থেকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করা উচিত?

উত্তর: সম্ভব হলে স্কুল শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই খেলাধুলা ও দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রস্তুতি দেওয়া ভালো।

প্রশ্ন: স্কুলে যাওয়ার আগে শিশুকে ফোন নম্বর শেখানো কি জরুরি?

উত্তর: হ্যাঁ। বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী অন্তত একজন অভিভাবকের প্রয়োজনীয় ফোন নম্বর মনে রাখতে শেখানো নিরাপত্তার জন্য উপকারী।

প্রশ্ন: শিশুকে স্কুলে যাওয়ার জন্য কীভাবে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা যায়?

উত্তর: স্কুল সম্পর্কে ইতিবাচকভাবে কথা বলা, গল্প করা, স্কুলের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং শিশুর ভয় বা প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে শোনা যেতে পারে।

১টি মন্তব্য for "প্রথম স্কুলে পাঠানোর আগে শিশুকে যা শেখাবেন: ৮টি জরুরি বিষয়"