Widget HTML #1

মেঘনা নদীর মোহনায় | হৃদয়স্পর্শী বাংলা প্রেমের গল্প | আল আব্বাস রবিন

বিষয়সূচি

কিছু ভালোবাসা জীবনে আসে খুব নিঃশব্দে, অথচ চলে যাওয়ার সময় রেখে যায় এক সমুদ্র সমান শূন্যতা। “মেঘনা নদীর মোহনায়” তেমনই এক হৃদয়স্পর্শী বাংলা প্রেমের গল্প—যেখানে ভালোবাসার সঙ্গে মিশে আছে অপেক্ষা, স্বপ্ন, প্রকৃতির সৌন্দর্য, পারিবারিক মায়া এবং প্রিয় মানুষকে হারানোর নির্মম বেদনা। গল্পের শুরুতে এক তরুণের জীবনে জেরিনের আগমন যেন হঠাৎ করে বদলে দেয় তার একাকী পৃথিবী। মেঘনার তীরে চাঁদের আলো, নদীর ঢেউ, পাখির ডাক আর সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্যের মাঝে তাদের ভালোবাসা ধীরে ধীরে গভীর হয়ে ওঠে। তারা দুজনেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের, সাজাতে থাকে নতুন সংসারের নানা কল্পনা। কিন্তু নিয়তি কখনো কখনো মানুষের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নকেও নির্মমভাবে ভেঙে দেয়। এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই তাদের সাজানো পৃথিবীতে নামিয়ে আনে অন্ধকার। ভালোবাসার মানুষকে হারানোর সেই অসহ্য কষ্ট, অপেক্ষা, স্মৃতি আর অপূর্ণ স্বপ্নের গল্পই “মেঘনা নদীর মোহনায়”।

নোট: বাংলা সাহিত্যের আরও কিছু হৃদয়স্পর্শী গল্প পড়তে চাইলে আমাদের সাহিত্য বিভাগ ঘুরে দেখতে পারেন।

মেঘনা নদীর মোহনায় বাংলা গল্পের দৃশ্য
মেঘনা নদীর মোহনায় — আল আব্বাস রবিনের লেখা একটি হৃদয়স্পর্শী বাংলা গল্প।

মেঘনা নদীর মোহনায়

হৃদয়স্পর্শী বাংলা প্রেমের গল্প
_লেখক: আল আব্বাস রবিন


পর্ব: ০১

মা-বাবা কেউ নেই। ছোটবেলাতেই তারা মারা গেছেন। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর দাদা-দাদি আমাকে লালন-পালন করেছেন।

একটু বড় হওয়ার পর যখন দাদাকেও হারালাম, তখন বাবা-মা আর চির আপনজন বলতে একমাত্র দাদিকেই পেলাম। তিনি তাঁর অফুরন্ত ভালোবাসা দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। ছোটবেলা থেকেই অনেক আদর-স্নেহ দিয়ে বড় করেছেন।

এখন তাঁর শেষ একটি মাত্র ইচ্ছা—আমাকে বিয়ে করিয়ে ফুটফুটে একটা নাতবউ দেখে তবেই তিনি মরতে চান।

এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করার ইচ্ছা না থাকায় শত চেষ্টা করেও দাদিকে মানাতে পারলাম না। পড়ালেখা আর পরীক্ষার অজুহাতে কিছুদিন কাটিয়ে দিলেও একটা সময় আর তাঁকে মানাতে পারলাম না।

অবশেষে আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে আমার জন্য মেয়ে দেখা হলো। এমন মুহূর্তে বিয়ে করার ইচ্ছা না থাকায় মেয়েটির ছবিও দেখিনি, নামটাও জানতে চাইনি। দাদির ইচ্ছার ওপরেই সব ছেড়ে দিলাম।

দাদির ইচ্ছাতেই কথাবার্তা সব ঠিকঠাক হয়ে বিয়ে পাকাপাকি হলো।

আমি আর বাঁচার সুযোগ না পেয়ে একটা শর্ত দিলাম—এখন বিয়ে হয়ে থাকবে, কাবিন করে রাখবে; তবে বউ তুলে আনবে আমার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার পর।

আমার শর্ত অনুযায়ীই তাই হলো। কাবিন হলো দুই লাখ টাকা। বউ দুই বছর পর তুলে আনব—এমনটাই ঠিক হলো।

এর মধ্যে আমার অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলো।

সিদ্ধান্ত নিলাম, গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাব। যেই ভাবনা, সেই কাজ। ছুটে চললাম গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

আমার গ্রামের বাড়ি ছিল বরিশাল বিভাগের ভোলা জেলায়।

আমার প্রিয় ভ্রমণ ছিল পানিপথে যাওয়া। তাই ঢাকা সদরঘাট পৌঁছে লঞ্চে চড়ে সোজা ভোলা লঞ্চঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

মাঝে তো এক রাত কেটে গেল চাঁদনি রাতে লঞ্চের ছাদে বসে। নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে ছোট ছোট নৌকায় টিপটিপ বাতির ঝলকানো আলো দেখতে দেখতে মনটা অন্য এক জগতে হারিয়ে গেল।

নদীর বুকে হালকা বাতাস, ঢেউয়ের মিষ্টি গর্জন—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি।

এর মাঝে কবিতার জগতে হারিয়ে গেলাম আমি—

নদীর বুকে ভাসছে তরী
মাথায় নিয়ে চাঁদ।
প্রকৃতি আমায় মুগ্ধ করেছে,
বানিয়েছে উন্মাদ।

সকালে লঞ্চঘাটে নেমে স্বজনদের বাড়িতে যেতে চাইলাম। কিন্তু এসে দেখি, আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন ঘাটে বসে আছে আমাকে নেওয়ার জন্য।

তাই বাধ্য হয়ে তাদের সঙ্গেই যেতে হলো।

বাড়িতে গিয়ে দেখি, এই স্নিগ্ধ ভোরে আমার শাশুড়ি মা খাবার নিয়ে বসে আছেন।

আমি গিয়ে সালাম করে টেবিলে বসলাম এবং হালকা কিছু খেয়ে নিলাম।

খেতে খেতে শাশুড়ি মা আমাকে নানা প্রশ্ন করলেন—পথে কোনো অসুবিধা হয়েছে কি না, দাদি কেমন আছেন ইত্যাদি।

সারারাত লঞ্চে জেগে ছিলাম, তাই নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছিল।

শাশুড়ি মা বুঝতে পেরে তাঁর মায়া জড়ানো কণ্ঠে বললেন,

—বাবা, পাশের রুমে বিছানা করা আছে। তুমি শুয়ে বিশ্রাম করো।

আমি শাশুড়ি মায়ের কথামতো পাশের রুমে চলে এলাম।

তারপর শুয়ে শুয়ে ভাবছি—কত মায়াবী মহিলাটা! আমাকে এই অল্প সময়েই কত আপন করে নিয়েছেন, কত সুন্দর করে আমার সঙ্গে কথা বলছেন।

আরও ভাবছিলাম আমার বউটার কথা। কেমন দেখতে? নামটা কী?

সবকিছু মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

রুমের মধ্যে শুয়ে থেকে বাইরের প্রকৃতিকে কল্পনা করছি। বেশ সুন্দর হবে নিশ্চয়ই। বিকেলে গ্রামটা ঘুরে দেখব—এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলাম।


পর্ব: ০২

প্রায় সাড়ে বারোটার দিকে কারও মধুর ডাকে ঘুম ভাঙল। কী বলে ডাকল, খেয়াল করিনি।

তবে চোখ খুলে যা দেখলাম, তাতে অবাক হতেও ভুলে গেলাম আমি।

পৃথিবীর কোনো পরীও তো এমন হতে পারে না!

মনে হলো, জান্নাত থেকে অপেক্ষাকৃত সবচেয়ে সুন্দর হুরটাকে আমার সামনে এনে রাখা হয়েছে।

মাথার চুলগুলো খুব সুন্দর করে এক পাশে ভাগ করে আঁচড়ানো। কপাল দিয়ে কয়েক গোছা চুল চোখের ওপর এসে পড়েছে। এতে মায়াবী কালো চোখের আকর্ষণ আরও বেড়ে গেছে।

ঘন পাপড়িওয়ালা দুই চোখের ঠিক মাঝ বরাবর নাকটি চিকন, যেন কোনো রাখালের সুরেলা বাঁশির উদাহরণ বহন করছে।

ঠোঁটের দিকে তাকালে মনে হয়, পাকা আপেলের চামড়া দিয়ে বড় কষ্টে তৈরি করা মধুর ছোট্ট একটি ঢেউ।

শরীরের গঠন দেখে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভূ-প্রকৃতিবিদও হার মানবে তা বর্ণনা করতে।

কোথাও কোনো কমতি নেই এই সৃষ্টিতে। বিধাতা যে তাঁর সৃষ্টিকে এত সৌন্দর্য দিয়েছেন, তা তিনি ছাড়া আর কারও পক্ষে বর্ণনা করাও সম্ভব নয়।

আমি অচেতন মনে কতক্ষণ চেয়ে ছিলাম জানি না।

পরের ইশারায় উঠে বসতেই মিষ্টি সুরে ভেসে এলো একটি উপদেশ—

—এত ঘুমোতে নেই। ওঠে গোসল করে নেন।

আমি ঘোর থেকে ফিরে কিছু বলব, কিন্তু ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।

এত সুন্দর মেয়ে, মায়াবী চোখ, মিষ্টি সুর, এমন ঘন কালো হালকা কোঁকড়ানো চুল—আগে কখনো দেখিনি।

আমি কিছু বলার আগেই মেয়েটি রুম থেকে চলে গেল।

আমি কিছুই জানতে পারলাম না—কে এই মেয়েটি?

শুধু ভাবছি, এটা কি স্বপ্ন, নাকি সত্যি?

একবার দেখেই যে এত মায়া লেগে গেল! ঘরের যেদিকে তাকাই, শুধু মেয়েটির ছবি ভেসে ওঠে। বারবার শুধু মেয়েটিকেই দেখতে পাই।

এমন সুন্দর রূপবতী নারী যেকোনো পুরুষের জীবনে ভাগ্যের ব্যাপার।

আমার ভাবনার জগৎ থেকে কিছুতেই মেয়েটাকে সরাতে পারছি না। ভাবতেই ভালো লাগছে মেয়েটির কথা।

ভাবনার জগৎ থেকে মুক্তি না পেয়ে গোসল শেষে রুমে বসে টিভি দেখছিলাম।

এমন সময় আবার মেয়েটি রুমে এলো। আপাদমস্তক ওড়নায় ঢাকা।

আমাকে জিজ্ঞাসা করল,

—নামাজ পড়বেন না?

আমি মাথা নেড়ে উত্তর দিলাম,

—পড়ব।

মেয়েটি একটি জায়নামাজ এনে আমার হাতে দিল এবং টিভিটা বন্ধ করে চলে গেল।

আমি নামাজ পড়ে সোফায় গিয়ে বসলাম।

মেয়েটি আমার জন্য খাবার নিয়ে এলো। আমার রুমে ডাইনিং নেই, তাই সোফাতেই খাবার দিল। কিন্তু এবার দেখলাম, দুইজনের খাবার।

মেয়েটি নিজের জন্যও খাবার নিল।

আমি এবার একটু সাহস করে জানতে চাইলাম,

—তোমার নাম কী?

আমাকে খাবার দেওয়া অবস্থায় একটু অভিমানী চোখে হাঁ করে তাকিয়ে রইল আমার দিকে।

আমি একটু ভয়ে চোখ নামিয়ে নিতেই মেয়েটি বলল,

—আমার নাম জেরিন। কেন, আপনি বুঝি জানেন না?

আমি অসহায়ের মতো মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলাম,

—না, জানি না।

এটা বলতেই মেয়েটি আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

আমিও আরও কিছু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।

আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে জেরিন তার খাবার নিয়ে রুম থেকে চলে গেল।

আমি খাবারে হাত দিয়েই ভাবছি মেয়েটির কথা। ঠিক এমন সময় মনে পড়ল—আমার শ্বশুরের একমাত্র মেয়ে!

তার মানে এই মেয়ে জেরিন আমার বউ?

আমি সঙ্গে সঙ্গেই কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম।

আমার বউ এত সুন্দর?

আর জেরিন আমার সঙ্গে খাবার খেতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি তাকে চিনতে পারিনি বলে রাগ করে চলে গেছে!

এমন সময় আমার শাশুড়ি মা আরও খাবার নিয়ে আমার রুমে এলেন।

আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম—জেরিন নিশ্চয়ই সব বলে দিয়েছে।

কিন্তু শাশুড়ি মা আমার প্লেটে খাবার দিতে দিতে বললেন,

—বাবা, জেরিন তোমাকে কিছু বলেছে?

আমি বললাম,

—না মা, কিছু বলেনি তো।

এটা বলতেই শাশুড়ি মা আমার দিকে তাকিয়ে কেঁদে দিলেন।

আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি বললেন,

—আমার কোনো ছেলে নেই। যে ছেলেটা ছিল, সেও সাত বছর বয়সে পানিতে পড়ে মারা গেছে। এমন করে কতদিন কোনো ছেলে তাকে মা ডাকেনি।

আমি তাকে সান্ত্বনার ভাষায় বললাম,

—আমারও তো মা নেই। আপনিই তো আমার মা।

একথা বলে আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না।

মা তাঁর আঁচল দিয়ে আমার চোখ মুছে দিয়ে বললেন,

—খেতে বসে কাঁদতে নেই বাবা। খেয়ে নাও।

খাওয়ার শেষ প্রান্তে মা আরও খাবার দিতে চাইলেন। অনেকবার বারণ করলাম, তবুও দিয়ে দিলেন।

আমি খাচ্ছি আর মা বললেন,

—জেরিন খুব রাগী মেয়ে। কিছু হলেই শুধু রাগ করে। এখন তোমার এখান থেকে গিয়ে খাবারগুলো রেখে দিয়ে রুমে চলে গেছে। সকালেও খায়নি, তোমার সঙ্গে খাবে বলে।

কথাটা শুনে আমার জেরিনের প্রতি মায়া ও ভালোবাসা আরও বেড়ে গেল।

আমি সঙ্গে সঙ্গেই খাওয়া শেষ করে আম্মুকে বলে খাবার নিয়ে জেরিনের রুমে গেলাম।

গিয়ে দেখি, জেরিন ড্রেসিং টেবিলের সামনে মাথা নিচু করে বসে আছে।

আমি জেরিনের মাথায় হাত দিলাম।

জেরিন মাথা তুলে আমার দিকে তাকাতেই দেখি, ওর চোখে পানি।

জেরিন তা লুকাতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না।

আমি জেরিনের হাতে একটি ছবি দেখে সেটা দেখতে চাইলাম। জেরিন দিতে চাইলো না। পরে আমার মন রাখতে ছবিটা দিল।

আমি ছবিটা দেখে নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

তিন মাস আগে আমাদের বিয়ে হয়েছে। কারও সঙ্গে কোনো দেখা বা কথা হয়নি। আমার যে ছবিটা ওকে পছন্দ করতে দেওয়া হয়েছিল, সেই ছবিটা নিয়ে মেয়েটি কাঁদছে।

কত স্বপ্নই না দেখেছে মেয়েটি এই ছবির মানুষটিকে নিয়ে!

অথচ আমি তো জেরিনের ছবি দেখিইনি। এমনকি ওর ছবি কোথায় রেখেছি, তারও কোনো খবর নেই।

আমি জেরিনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, কত বড় অপরাধ করেছি আমি—প্রথম থেকেই জেরিনের কথা চিন্তা না করে।

সেই ভুলের কিছুটা মাশুল দিলাম নিজ হাতে জেরিনকে খাইয়ে দিয়ে। নানা গল্পে ভুলিয়ে দিলাম ওর ক্ষণিকের কষ্ট।

আর জেরিনকে বললাম, ওদের গ্রামটা ঘুরে দেখব।

জেরিন বলল, নিয়ে যাবে। তবে আসর নামাজের পর।

আম্মুও আমাদের ভালোবাসার এই মুহূর্তটা দেখে বেশ খুশি হলেন।


পর্ব: ০৩

আমি আসরের নামাজ পড়ে জেরিনের রুমে গেলাম।

গিয়ে দেখি, ও এখনো জায়নামাজে।

আমি ওর খাটে বসে অপেক্ষা করছি।

জেরিনের নামাজ শেষে আমার সামনে পোশাক পরিবর্তন করতে লজ্জা পাচ্ছে দেখে আমি বাইরে চলে এলাম।

জেরিন কিছুক্ষণের মধ্যে পোশাক পরিবর্তন করে আমার সামনে এলো।

নীল রঙের ব্রাউন ড্রেস, সঙ্গে ওড়না দিয়ে হিজাব।

আমি দেখে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে জেরিন এত রূপে রূপবতী।

আমি জেরিনের হাত ধরে চলতে শুরু করলাম।

জোয়ার-ভাটার পানি তখন নিচের দিকে নামছে। আমরা ভাটার দিকেই হাঁটছি।

মাঝে মাঝে আমাদের সামনে দিয়ে ছোট-বড় গুইসাপ রাস্তার এপার থেকে ওপার যাচ্ছে।

আমি ভয় পেলে জেরিন আরও শক্ত করে আমার হাতটা ধরে অভয় দিচ্ছে।

আমি মনের তৃপ্তি নিয়ে আনন্দচিত্তে হাঁটছি আমার বউ জেরিনের হাত ধরে।

পাশে ছোট ছোট নৌকা উপনদীতে চলছে। গাছে পাখিরা এ ডাল থেকে ও ডালে ছুটোছুটি করছে কিচিরমিচির ডাকে।

মৌসুম ছাড়া কাঠবিড়ালিগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে ফল খুঁজছে এক বুক নিরাশা নিয়ে।

এর মাঝে জেরিনের হাত ধরে চলে এলাম একটি নিরিবিলি জায়গায়।

পাশেই নদীটা মিশে গেছে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে।

সূর্যটা লাল রূপ ধারণ করে সাগরের মাঝ বরাবর ডুবে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আকাশটা সূর্যটাকে হারিয়ে ফেলার শোকে পূর্ব দিকে ঈষৎ রাগান্বিত হয়ে আছে।

আশপাশে কেউ নেই। শুধু আমি আর জেরিন।

আমরা একে অপরকে প্রাণ ভরে দেখছি। যেন চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেছি আমরা।

জেরিন দেখাদেখির এক ফাঁকে নীরবতা ভেঙে বলল,

—জানেন, এভাবে কারও হাত ধরে সূর্যডোবা দেখব বলে কতদিন আশায় ছিলাম। আমি গত তিন মাসে আপনাকে নিয়ে কত কিছু ভেবে রেখেছি, কত স্বপ্ন দেখেছি। আরও কত কী যে করেছি, তার কোনো হিসাব নেই।

অত্যন্ত উৎফুল্ল চিত্তে আনন্দমাখা চোখে কথাগুলো বলল সে।

সঙ্গে সঙ্গেই আবার আমাকে জিজ্ঞাসা করল,

—আচ্ছা, আপনিও কি এমন কিছু ভেবেছেন?

আমি নিশ্চুপ। কিছুই বলার ছিল না আমার।

নীরব দেখে জেরিন নিজেই বলল,

—আপনি অন্য কাউকে ভালোবাসেন, তাই না?

আমি সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলাম,

—আরে না! আমি কাউকেই ভালোবাসিনি। আর আমার ভালোবাসার সাহস কোথায় বলো? ভালোবাসার জন্য একটা ‘মা’ই তো নেই আমার। যে দাদি এত কষ্ট করে লালন-পালন করছে, সব ভালোবাসা তাঁকে ঘিরেই রয়েছে। আর পড়ালেখার যে চাপ, ভালোবাসার সময় কোথায়?

তবে আজ দুপুর থেকে তোমাকে অনেক ভালোবেসেছি।

আমার সারাজীবনের জমানো সব ভালোবাসা আমি তোমাকে দেব। তুমি আমার হৃদয়ের একমাত্র রানী।

এ কথা শুনে জেরিনের মুখ লজ্জায় বিকেলের অস্ত যাওয়া সূর্যের মতো লাল হয়ে গেল।

মনে হলো, জেরিন খুব গর্ববোধ করছে—কেউ তাকে এত ভালোবাসে, তার জন্য।

আমি বুঝতে পেরে আমার ভালোবাসা প্রকাশ করতে জেরিনকে কাছে টানতে চাইলাম।

কিন্তু জেরিন বলল,

—আমি কখনো কোনো বেগানা পুরুষকে স্পর্শও করিনি এবং কাউকে কখনো ভালোবাসিনি। আমার জীবনের প্রথম ভালোবাসা একমাত্র আপনি। আমার সব আশা-ভরসা, শখ-আহ্লাদ সব আপনাকে ঘিরে।

তাই আমি চাই, যেদিন আপনি আমাকে আপনার বাড়িতে তুলে নিয়ে যাবেন, ঠিক সেদিন আমাদের চিরকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের বাসরঘরে আমাদের ভালোবাসার পূর্ণতা আসুক।

আমি এমন শর্তে অনেকটা হতচকিয়ে গেলাম।

জেরিনকে বললাম,

—আমরা তো স্বামী-স্ত্রী। আমাদের বিয়ে হয়েছে। সুতরাং আমাদের সব সম্পর্কই বৈধ ও পবিত্র।

জেরিন লজ্জামাখা সুরে বলল,

—তা ঠিক। কিন্তু আমি চাই, আপনাদের বাড়িতে আমাদের বাসরঘরেই আমাদের ভালোবাসার প্রথম পূর্ণতা আসুক। আমাদের একে অপরের সব ভালোবাসা সেদিন প্রকাশ করব।

আমি আর কিছু না ভেবে জেরিনের ভালোবাসার মহত্ত্ব দেখে বললাম,

—আচ্ছা জান, তুমি যা চাও ঠিক তাই হবে। লক্ষ্মী...

এ কথা শুনে জেরিন আরও লজ্জা পেল। আমার হাতটা ছেড়ে এক দৌড়ে একটু দূরে চলে গেল।

আমি সন্ধ্যা নেমে আসছে দেখে জেরিনের পিছু ছুটলাম।

একটু পরেই জেরিনের হাত ধরে ফেললাম। জেরিনও শক্ত করে আমার হাত ধরল।

আমি জেরিনকে নিয়ে হাঁটছি আর কথা বলছি।

কথার এক ফাঁকে জেরিনকে বললাম,

—জেরিন, তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো, তাই না?

জেরিন উত্তরে বলল,

—ওই যে নদীতে জাহাজটা দেখছেন, এই জাহাজটা যতটুকু ভালোবাসার বলে নদীর বুকে ভাসছে, আমি তার চেয়ে কোটি গুণ বেশি তোমাকে ভালোবাসি।

আরও নানা রকম মধুর কথায় জেরিন আমার মন ভরিয়ে দিল।

পথে হাঁটতে হাঁটতেই মাগরিবের আজান হয়ে গেল।

আমরা তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে এলাম।

এসে আমি ওযু করে নামাজ পড়লাম। জেরিনও তার রুমে গিয়ে নামাজ পড়ে নিল।


পর্ব: ০৪

সন্ধ্যা সাতটা বাজে।

নামাজ পড়ে রুমেই বসে আছি।

আম্মু এসে নাস্তা দিয়ে গেলেন।

নাস্তা খেতে খেতে শ্বশুর মশাই এসে বসলেন।

আমি সালাম করে বসতেই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,

—কোনো কষ্ট হয়নি তো আসতে?

আমি বললাম,

—না বাবা, কোনো কষ্ট হয়নি। ঠিকমতোই এসেছি।

শ্বশুর মশাই আমাকে খুঁটিনাটি অনেক কিছুই জিজ্ঞাসা করলেন—আমার দাদি কেমন আছেন, মা-বাবার কী হয়েছিল, কীভাবে মারা গেলেন ইত্যাদি।

আমি কথা বলছি আর মনে মনে ভাবছি, কত ভালো মানুষগুলো! কী মায়া জড়ানো কথা বলেন। একেবারেই নিখুঁত তাঁদের আচার-ব্যবহার।

মাত্র একদিনেই এই অচেনা মানুষগুলো কত আপনজনে পরিণত হয়েছেন!

মনে হচ্ছে, মা-বাবা বুঝি এমনই হয়।

মা-বাবার আদর-স্নেহ-ভালোবাসা না পাওয়ার যে তৃষ্ণা, তা অনেকটাই লাঘব হলো।

আমার সঙ্গে কথা শেষে শ্বশুর মশাই চলে গেলেন।

তখন রাত প্রায় ১০টা বাজে।

আমি এশার নামাজ পড়ে জেরিনের কথা ভাবছি। কতক্ষণ দেখিনি জেরিনকে! খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। একটা মুহূর্তও জেরিনকে না দেখে থাকতে পারছি না।

আমি উঠে জেরিনের রুমে গেলাম।

গিয়ে দেখি, জেরিন ড্রেসিং টেবিলের সামনে সাজছে।

আমি দূরে দাঁড়িয়ে তা দেখছি।

মনে হচ্ছে, ঘরের এক কোণে একটি পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে। সেই চাঁদের আলোয় পুরো ঘরটা আলোকিত।

ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় পূর্ণিমার চাঁদটা ঝলমল করছে।

বিদ্যুতের বাল্বটাও মলিন হয়ে গেছে আমার জেরিনের রূপের ঝলক দেখে।

আমি আস্তে আস্তে জেরিনের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

জেরিন আয়নায় আমাকে দেখে হঠাৎ ভয় পেয়ে থমকে গেল।

আমি জেরিনকে অভয় দিয়ে বললাম,

—এত সেজেছ কার জন্য?

জেরিন উত্তরে বলল,

—আমার সব সাজগোজ, রূপ-সৌন্দর্য—সবকিছুই তো তোমার জন্য। আমার মন, প্রাণ, সবকিছু তো তোমার কথাই বলে।

আমি জেরিনকে পাশে রেখে আয়নায় ওকে দেখছি আর নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করছি এমন একজন জীবনসঙ্গী পেয়ে।

জেরিন ভালোবাসার আবেগে আরও কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু আম্মু খাবার খেতে ডাকছেন।

জেরিন উঠে চলে যেতে চাইলো। আমি ওর হাত ধরে কাছে নিয়ে এসে বললাম,

—তোমাকে ছাড়া ঘুমাব কীভাবে?

একটু ঘুমের ওষুধ দাও না, লক্ষ্মী।

জেরিন অনেক লজ্জা পেয়ে এক টানে আমার হাতটা ছেড়ে দৌড়ে চলে গেল।

আমিও জেরিনের পিছু পিছু ড্রইংরুমে গেলাম।

গিয়ে দেখি, ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজানো আছে।

শ্বশুর মশাই এসে বসতে বসতে একটা চেয়ার টেনে দিয়ে বললেন,

—বসো বাবা, রাতের খাবার সবাই একসঙ্গে খাব।

আমি আম্মুকে ডাক দিয়ে বসে গেলাম।

জেরিন আমাদের সবার জন্য দুধ নিয়ে এসে টেবিলে রেখে খেতে বসল।

আম্মু আরও গোশত এনে খেতে বসলেন।

সবাই একসঙ্গে খাবার শুরু করলাম।

আমার খুব ভালো লাগছিল এমন একটি পরিবারে নিজেকে জামাই ভেবে।

ভাবছিলাম, আমার বাবা-মা থাকলে আমিও এমন হাসিখুশি একটি পরিবারে বড় হতে পারতাম।

তখন আমার দাদির কথা খুব মনে পড়ল।

খাবার শেষে আম্মু সবাইকে নিজেদের লালন করা গরুর দুধ দিলেন।

আমি খেয়ে আম্মুর আঁচল দিয়ে মুখ মুছলাম। দেখি, আম্মু অনেক খুশি হলেন, আর আমারও অনেক ভালো লাগল।

খেয়ে রুমে চলে এসে দাদির সঙ্গে ফোনে কথা বললাম।

সব ঠিক আছে জানতে পেরে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছি।

ঘুমের তো কোনো দেখাই নেই।

আমার কল্পনা জুড়ে শুধুই জেরিন।

আমার ভাবনার মাঝে জেরিনের ছায়া বসবাস করছে।

এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দেখি, দরজায় এক রানী দাঁড়িয়ে আছে।

এই রানীর বিবরণ পৃথিবীর কোনো নারীতত্ত্ববিদ দিতে পারবে না। শেক্সপিয়রের মোনালিসাকেও জেরিনের সামনে কাঠখণ্ডের মতো মনে হবে।

আমি উঠে বসতেই জেরিন আমার দিকে এগিয়ে আসতে চাইল।

কিন্তু শাড়ি পরার কারণে হাঁটতে পারছে না।

আমি এগিয়ে গিয়ে জেরিনের হাতটা ধরলাম।

জেরিন ভয়ে কাঁপছে।

আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।

আজ জেরিন নতুন বউয়ের মতো অনেক সুন্দর করে সেজেছে। খুব সুন্দর লাগছে ওকে।

আমি জেরিনকে পাশে বসালাম।

জেরিন ভয়ে ভয়ে বলল,

—আম্মু পাঠিয়ে দিয়েছে। এখানে থাকতে হবে আপনার সঙ্গে।

আমি তো অবাক হয়ে গেলাম। খানিকটা লজ্জাও পেলাম, কিন্তু খুশি হলাম সবচেয়ে বেশি।

জেরিনের ভয়টা আরও বেড়ে গেল।

আমি জেরিনকে অভয় দিতে চাইলে জেরিন কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল,

—কিছু করবেন না তো?

আমি কিছু না বলে জেরিনের কপালে একটি চুমু দিলাম।

জেরিনের চোখেমুখে লজ্জা ফুটে উঠল।

আমি জেরিনকে বললাম,

—আমি তোমার স্বামী। আমাকে তোমার বিশ্বাস হয় না?

জেরিন মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিল,

—হয়।

আমি জেরিনের বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে ওর পাশে শুয়ে পড়লাম।

জেরিনও আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

আমি জেরিনকে বললাম,

—আজ সারারাত গল্প করে কাটিয়ে দেব। তুমি বলবে, আর আমি শুনব।

জেরিন খুব খুশি হলো।

আর বলতে শুরু করল ছোটবেলার নানা দুষ্টুমির কথা, পুতুল খেলা আর রূপকথার দেশের পরীদের গল্পগুলো—যা ছোটবেলার ঘুমের দেশে নিতে বাবা-মা ব্যবহার করতেন।

আমি এসব শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে গেছি জানি না।

মাঝরাতে জেগে দেখি, জেরিন ঘুমিয়ে আছে। রাতের নীরবতায় তার শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, এতদিনের অপেক্ষা যেন আজ পূর্ণতা পেয়েছে।

আমিও জেরিনকে যত্ন করে পাশে রেখে আবার ঘুমিয়ে গেলাম।


পর্ব: ০৫

সকাল ভোরে প্রকৃতি তার চিরচেনা রূপেই দেখা দিল।

মুয়াজ্জিন মসজিদের স্বগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা মিনার থেকে আজানের মাধ্যমে নামাজের গুরুত্ব জানিয়ে দিলেন।

লাল রঙ ধারণ করে পূর্ব আকাশে সূর্য উঠেছিল শিশিরভেজা হালকা কুয়াশার মাঝে।

পাখির কলতানে সকালে প্রকৃতির ঘুম ভেঙেছিল।

মাঝিরা নৌকা নিয়ে ছুটেছিল নদীর বুকে।

খেজুরের রস নামাতে গাছে উঠেছিল রসওয়ালারা।

আমার অবশ্য কিছু দেখা হয়নি, কারণ আমি তখনও ঘুমে অচেতন ছিলাম।

সকাল ৮টার দিকে ঘুম থেকে উঠলাম।

সূর্য তখন তার উজ্জ্বল আলোয় পৃথিবীকে আলোকিত করে তুলেছে।

আমি বিছানায় নিজেকে একা আবিষ্কার করলাম।

শরীরে কালো রঙের একটি কম্বল জড়ানো।

বুঝতে পারলাম, শেষ রাতে একটু শীত পড়ায় জেরিন কম্বল দিয়ে নামাজ পড়তে চলে গেছে।

উঠে ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে নিলাম।

তারপর টিভিটা চালু করে দেখছিলাম।

আম্মু নাস্তা নিয়ে এলেন।

আমি নাস্তা খাচ্ছি, আম্মু জিজ্ঞাসা করলেন,

—রাতে কোনো সমস্যা হয়নি তো বাবা?

আমি বললাম,

—না মা, সব ঠিক আছে। কোনো সমস্যা হয়নি।

এর মধ্যে আব্বু এলেন সব ঠিক আছে কি না জানতে চাইতে।

একই উত্তর দিলাম।

আব্বু নিশ্চিত হয়ে বললেন,

—আমি অফিসে যাচ্ছি। ড্রাইভার আমাকে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে আসবে। তুমি গিয়ে গ্রামটা ঘুরে এসো।

আমি বললাম,

—জি।

মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলাম।

তারপর শ্বশুর-শাশুড়ি দুজনেই রুম থেকে চলে গেলেন।

আমার নাস্তা করা শেষ।

জেরিন আমার রুমে এলো।

এসেই অভিমানের সুরে বলল,

—তুমি খুব স্বার্থপর! আমাকে রেখেই নাস্তা করছ। একবার আমার কথা মনেও পড়ল না তোমার!

আমার কিছুই বলার ছিল না।

অপরাধীর মতো তাকিয়ে আছি জেরিনের দিকে।

জেরিন বুঝতে পেরে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

কিন্তু আমার চোখের পলক আর পড়ছে না। কারণ জেরিনকে এখন অন্য রকম লাগছে।

খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে আমার সামনে।

কোনো সাজগোজ নেই। একেবারে সাধারণ একটি মেয়ে।

হয়তো এই মাত্র গোসল করেই আমার রুমে এসেছে তার প্রিয় ভালোবাসার মানুষটিকে মন ভরে দেখতে।

এই সাধারণ ও প্রকৃত রূপে জেরিনকে অতি সুন্দর লাগছে।

আমি জেরিনকে বললাম,

—জেরিন, তোমার চুলগুলো একটু ধরব?

জেরিন আমার হাত ধরে সোফায় টেনে এনে বসাল।

তারপর আমার পাশে বসে কাঁধে মাথা রেখে বলল,

—আমার দেহের সবকিছুই তো তোমার। তুমি ধরবে না তো কে ধরবে?

আমি এমন স্বাধীনতা পেয়ে ওর চুলে হাত দিয়ে বিলি কাটতে লাগলাম।

জেরিন টিভি দেখছে আর আমি জেরিনকে দেখছি।

কিছুক্ষণ পর ড্রাইভার এলো গাড়ি নিয়ে।

আমি জেরিনকে রেডি হতে বললাম।

জেরিন কপালটা বাঁকা করে বলল,

—আমি কোথায় যাব?

আমি বললাম,

—তোমার প্রেমিকের সঙ্গে ঘুরতে যাবে!

জেরিন একটু হাসিমুখে বলে উঠল,

—আমার আবার প্রেমিক আছে নাকি?

আমি একটু অভিমানের সুরে বললাম,

—তবে আমি কী?

জেরিন আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

—তুমি তো আমার জান-প্রাণ, আমার আত্মা, আমার সবকিছু।

বলেই দৌড়ে রুম থেকে চলে গেল।

আমি রেডি হয়ে বাইরে গেলাম।

গিয়ে ড্রাইভারকে বললাম,

—তোমার যেতে হবে না। আমি আর জেরিন যাব।

জেরিনও রেডি হয়ে চলে এলো।

দুজনে পাশাপাশি বসে চলছি গ্রামটা ঘুরে দেখতে।

আমি গাড়ি চালানোর ফাঁকে ফাঁকে জেরিনের দিকে তাকিয়ে দেখছি।

জেরিন আমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল,

—এভাবে দেখতে হবে না। ভালো করে গাড়ি চালাও।

চলতে চলতে নানা কথা আর গল্পগুজবে মেতে উঠলাম।

নদীর পাড়ে বসে দুজন দুজনার কাঁধে মাথা রেখে হারিয়ে যাই দূর অজানায়।

পাখিরা ডানা মেলে আকাশে উড়ে যায় আর যেন তাকিয়ে থাকে আমাদের দিকে।

নদীর মাছগুলো হয়তো তীরে চলে আসছে আমাদের মধুর গল্প শুনতে।

দুপুরে বাসায় যাইনি। বাইরেই খেয়েছি দুজন।

খাবার খেয়ে নদীর পাড়ে ঘোরাফেরা করা, নৌকায় চড়া—এসব নিয়ে মেতে উঠলাম।

এভাবে আমাদের বাঁধভাঙা আনন্দে প্রকৃতির বুঝি খুব হিংসে হলো।

সূর্যটাকে কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের মাঝ থেকে। সন্ধ্যা নামক অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে চাইছে আমাদের।

আমি জেরিনকে বললাম,

—আম্মু চিন্তা করবে। চলো বাসায় চলে যাই।

জেরিন যেতে রাজি নয়। আরও কিছুক্ষণ থাকতে চায়।

আমি অনেকটা জোর করেই জেরিনকে নিয়ে এলাম।

বাসায় আসতে আসতে সন্ধ্যা ৭টা।

আম্মু তো চিন্তায় অস্থির।

আমাদের দেখে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

আমার এতক্ষণে মনে পড়ল, যাওয়ার সময় ফোন নিতে ভুলে গেছি। তাই হয়তো আম্মু ফোন করেও পাননি।

জেরিন সব বুঝতে পেরে আম্মুকে জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইল।

আম্মুও রাগী মুখে হেসে দিলেন।

আমিও আম্মুর দিকে তাকিয়ে রুমে চলে গেলাম।

আমাদের গাড়ি নিয়ে আসতে দেরি হয়েছে বলে আব্বু একাই অফিস থেকে চলে এসেছেন।


পর্ব: ০৬

রাতে সবাই একসঙ্গে খাবার খেতে বসেছি।

খেতে খেতে আব্বুকে বললাম,

—কালকে আমার বাসায় চলে যেতে হবে।

কথাটা শুনেই যেন জেরিন আকাশ থেকে পড়ল।

হঠাৎ ‘থ’ হয়ে একবার আমার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিল।

মনে হচ্ছে, কোনো বিষাক্ত সাপ ছোবল দিয়ে বিষে বিষাক্ত করে দিয়েছে আমার জেরিনকে।

জেরিন মোটেও প্রস্তুত ছিল না আমার এমন হঠাৎ চলে যাওয়ার কথা শুনতে।

আব্বু কিছু জানতে চাইবেন, তার আগেই জেরিন খাবার রেখে চলে গেল।

আমি আব্বুকে বললাম,

—আমার প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা বাকি আছে। এগুলো শুরু হচ্ছে। আমি কয়েক দিনের জন্যই এসেছিলাম। আর এটাও বললাম যে, গতকাল আমার কিছু বন্ধু ঢাকা থেকে রওনা হয়ে কুয়াকাটা গিয়েছে। কাল ওরা কলেজে চলে যাবে। আমিও ওদের সঙ্গে চলে যেতে চাইছি।

আব্বু কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,

—যাবে যখন, তখন আর কী করার! পরীক্ষা তো দিতে হবে। তবে তোমার বন্ধুদের কাল সকালে আমার বাসায় আসতে বলো। এখানে এসে নাস্তা করে তোমরা সবাই একসঙ্গে চলে যেও।

আমি আব্বুর কথায় সম্মতি দিয়ে খেতে মনোযোগ দিলাম।

খাওয়ার মাঝে আরও অনেক কথাই হলো আমাদের মধ্যে।

আম্মুও পাশে অনেকটা মন খারাপ করে বসে ছিলেন। তেমন কোনো কথা বলেননি।

রাত প্রায় ১১টা বাজে।

আমি কথা শেষ করে রুমে গিয়ে দেখি, জেরিন আমার খাটে বসে আছে।

আমি কাছে গিয়ে দেখি, কাঁদতে কাঁদতে জেরিনের চোখ ফুলে গেছে।

আমিও একটু মন খারাপ নিয়ে বললাম,

—আরে পাগলী, আমি কি মরে যাচ্ছি নাকি? পরীক্ষাগুলো দিয়ে তো তোমাকে একেবারেই নিয়ে যাব আমার বাসায়।

আমি কথা বলতেই জেরিন আরও জোরে কাঁদতে লাগল।

আর আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

—তোমাকে ছাড়া আমি থাকব কী করে? আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেব না।

আজ নিজেকে সত্যি একজন ভাগ্যবান স্বামী মনে হলো।

জেরিন আজ বুকের গভীরে আমাকে চেপে ধরেছে।

আমি এতটা মায়ায় জড়িয়ে নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না।

জেরিনকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললাম,

—তুমি তো আমার জীবনের সকল ভালোবাসার একমাত্র অধিকারী। তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। সারাজীবন তোমার পাশেই থাকব।

জেরিন বলল,

—আমার কথা তুমি ভুলে যাবে না তো?

আমি জেরিনের চোখে চোখ রেখে বললাম,

—গাছ কি কখনো তার ফুলকে ভুলতে পারে? তোমাকে ভুলে যাব, এও কি কখনো সম্ভব?

জেরিন আমাকে বিছানায় শুইয়ে দিল।

আমিও জেরিনের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম।

জেরিনও ওর মায়াবী কোমল হাতে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।

আমি এত আদরে কখন ঘুমিয়ে গেছি জানি না।

সকাল ভোরেই উঠে মসজিদে গিয়ে ফজরের নামাজ পড়লাম।

নামাজ পড়ে রুমে এসে দেখি, জেরিন আমার কাপড় ইস্ত্রি করেছে, জুতা রং করছে।

আমি জেরিনকে বললাম,

—আমার কয়েকজন বন্ধু আসছে। ওদের এগিয়ে নিয়ে আসি।

জেরিন বলল,

—গাড়ি নিয়ে যেতে।

আমি গাড়ি নিয়ে ঘাটে গিয়ে দেখি, আমার বন্ধু আরাফাত, তুলি, জাহিদ, সালমা, হাফিজ, আক্তার ও ফারজানা ঘাটে চলে এসেছে।

ওরা আমাকে দেখে বেশ খুশি হলো।

আমি ওদের গাড়িতে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির দিকে রওনা করলাম।

পথে যেতে সব কুশল বিনিময় হলো।

আমি ওদের কাছে কুয়াকাটার কথা জিজ্ঞাসা করলাম।

ওরাও আমার শ্বশুরবাড়ি আর বউ কেমন, জানতে চাইলো।

কথা বলতে বলতে বাসায় চলে এলাম।

আমি ওদের নিয়ে ড্রইংরুমে বসছি।

তুলি, ফারজানা আর সালমা তাড়াতাড়ি করে চলে গেল সরাসরি জেরিনের কাছে।

আক্তার, আরাফাত, হাফিজ, জাহিদ ওদের যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও যেতে পারল না।

শ্বশুর মশাই ড্রইংরুমে আমাদের জন্য নাস্তা নিয়ে এলেন।

তখন সবার সঙ্গে কথা ও পরিচয় হলো।

নাস্তা শেষে আব্বু বললেন,

—তোমরা থাকো। আমার অফিস যেতে হবে।

আমরাও কিছুক্ষণ পর চলে যাব বলে বিদায় জানিয়ে দিলাম।

আমি আমার রুমে গিয়ে দেখি, সালমা আর তুলি জেরিনের সঙ্গে কথা বলছে।

আমার ব্যাগ-লাগেজ সব রেডি।

আমি খেয়াল করলাম, জেরিন তুলি আর সালমার সঙ্গে কথা বললেও জেরিনের মন খুব খারাপ।

তুলি আর সালমা বুঝতে পেরে বেশি কিছু বলল না।

ওরা ড্রইংরুমে চলে গেল।

আমি আম্মুর কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলাম।

গিয়ে দেখি, আম্মু কাঁদছেন।

আমি সালাম করে সান্ত্বনার ভাষায় বললাম,

—চিন্তা করবে না মা। আমি কিছুদিন পরপর আসব।

আম্মু একটু এগিয়ে এসে আমার হাতে দশ হাজার টাকা দিলেন।

নিতে না চাইলেও জোর করে দিয়ে দিলেন।

আর বললেন,

—তোমার বাবা তোমাদের জন্য গাড়ি পাঠিয়েছে। ড্রাইভার তোমাদের লঞ্চঘাট পর্যন্ত দিয়ে আসবে।

আমি কথা শেষ করে রুমে আসতেই জেরিন আমাকে জড়িয়ে ধরল।

কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না।

আমি জেরিনকে শান্তনা দিয়ে বললাম,

—আর মাত্র কটা দিন। পরে আমার বাড়িতে নিয়ে যাব। তখন আর আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও ছেড়ে থাকতে হবে না।

জেরিন চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল।

আমি পকেট থেকে দুই হাজার টাকা বের করে দিয়ে বললাম,

—এটা খরচ করো। কিছু কেনার প্রয়োজন হলে কিনে নিও।

জেরিন নিতে চাইলো না। আমি একটু রাগ করেই দিলাম।

তারপর জেরিনকে বললাম,

—তুমি আমাকে কিছু দেবে না?

জেরিন অপ্রস্তুতভাবে আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে বিদায়ের ভালোবাসা জানাল।

আমি এক অন্য আবেগে বিভোর হয়ে গেলাম।

ওপাশ থেকে বন্ধু আরাফাত ডাক দিল।

আমি বললাম,

—রুমে আয়।

ওরা অনেক আনন্দচিত্তেই রুমে এলো, জেরিনকে দেখবে এই ভেবে।

কিন্তু এসে পুরোপুরি হতাশ।

কারণ জেরিন আরও আগেই রুম থেকে চলে গেছে।

ড্রাইভার এসে আমাদের ব্যাগ-লাগেজ গাড়িতে তুলে নিল।

আমরা বের হতেই আম্মু এসে আমাদের শেষ বিদায় দিলেন।

হাফিজ, আক্তার, জাহিদ জেরিন আসার একটু অপেক্ষা করলেও জেরিন আমাদের বিদায় দিতে বাইরে এলো না।

আমি জেরিনকে বাইরে না দেখলেও খেয়াল করলাম, জানালার পর্দার ফাঁকে জেরিন আমাদের দেখছে।

গাড়িতে জায়গা না হওয়ায় পূর্বের মতোই আমরা আবার চাপাচাপি করে বসলাম।

গাড়িতে বসতেই আমার ফোনে একটি মেসেজ এলো—

“Shabdhane jaben. Giya phoon korben kintu...
...ur love”

মেসেজটা দেখে অনেক খুশি হলাম।

ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে ছুটছে লঞ্চঘাটের দিকে।

জাহিদ, হাফিজ, আক্তার, আরাফাত আফসোস করছে জেরিনকে দেখতে না পেরে।

তুলি, সালমা আর ফারজানা ওদের সঙ্গে মজা করছে।

আমি ওদের দিকে এতটা মনোযোগ না দিয়ে আপনমনে ভাবছি আমার জেরিনের কথা...

নোট: এরকম আরও একটি হৃদয়স্পর্শী গল্প পড়তে চাইলে “রাতকানা বউ” গল্পটিও পড়তে পারেন।


পর্ব: ০৭

প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ড্রাইভার ভোলা লঞ্চঘাটে এসে পৌঁছাল।

ড্রাইভার দুইজন কুলি ডেকে আমাদের লাগেজসহ লঞ্চে নিয়ে গেল।

আমি টিকিট কেটে বন্ধুদের নিয়ে লঞ্চে উঠে গেলাম।

লঞ্চ তার বুক কাঁপানো বিকট শব্দের হর্ন বাজিয়ে ছুটে চলল নদীর বুকে।

আমরাও নদীমাতৃক এই দেশের সৌন্দর্য মন ভরে উপভোগ করছি।

বন্ধু আরাফাত তার গিটার নিয়ে মেতে উঠল গানের সুরে।

হাফিজ, আক্তার, জাহিদ ওর সঙ্গে তাল মিলিয়ে লঞ্চটাকে আনন্দের মুহূর্তে মাতিয়ে তুলল।

তুলি, সালমা আর ফারজানা লঞ্চের এক পাশে বসে সেলফি তুলতে ব্যস্ত।

আমার মনটা ছুটোছুটি করছে কারও জন্য।

আমি সময়টাকে আরও আনন্দঘন করতে ওদের সবাইকে ডেকে লঞ্চের ছাদে চলে গেলাম।

ছাদে গিয়ে দাঁড়াতেই জেরিনের ফোন বাতাসের সঙ্গে ভেসে এলো।

আমি রিসিভ করতেই ওপার থেকে মধুর কণ্ঠে ভেসে এলো,

—আপনি এখন কোথায়?

—আমি লঞ্চে। তোমার কথা ভাবছি। তুমি কী করো?

উত্তরে জেরিন বলল,

—বসে বসে আপনার কথা ভাবছি। যদি আপনার সঙ্গে চলে যেতে পারতাম, তবে খুব ভালো হতো। আপনাকে ছাড়া কিছুই ভালো লাগছে না।

আমি বললাম,

—বাসায় গিয়ে দাদিকে বলে শিগগিরই তোমাকে আমার বাড়িতে নেওয়ার ব্যবস্থা করব।

নীল আকাশের হালকা মেঘমালা বয়ে চলার সঙ্গে নদীর বুকের লঞ্চও চলছে।

আর সঙ্গে চলছে আমার আর জেরিনের আবেগমাখা রঙিন স্বপ্নের কথা।

জেরিন আর আমার দুজনেরই ফোনে টাকা শেষ, তবুও আমাদের কথা শেষ হয় না।

আমার এমন অবস্থা দেখে বন্ধু তুলি এগিয়ে এলো।

ওর সঙ্গে সবাই এসে আমার সঙ্গে মজা করতে লাগল।

এভাবেই আনন্দে ভরা সময় কাটিয়ে আমরা যে যার বাড়িতে পৌঁছে গেলাম।

আমি বাড়িতে এসে আবার জেরিনকে ফোন করে পৌঁছানোর খবর দিলাম।

খবর পেয়ে জেরিন খুশি হলো বটে, তবে প্রত্যাশাটা কী ছিল তা আমি উপলব্ধি করতে পারলাম।

আমি আবার পড়ালেখায় মনোযোগ দিলাম।

কিন্তু মন জেরিনকে নিয়েই সর্বদা ব্যস্ত থাকে।

ভাবছি, কবে যে পরীক্ষা শেষ হবে আর জেরিনকে আপন করে কাছে পাব!

আমার এমন অবস্থা দেখে দাদি খুব চিন্তিত।

পড়ালেখা না করে শুধু জেরিন আর জেরিন।

ওদিকে জেরিনও শুধু আমার কথা ভাবছে দিবানিশি।

দাদি আমার কষ্ট উপলব্ধি করতে পেরে সিদ্ধান্ত নিলেন—আর অপেক্ষা নয়।

আগামী মাসেই জেরিনকে নিয়ে আসবেন আমাদের বাসায়।

আমি তো অনেক খুশি হলাম।

আর জেরিন তো মহাখুশি।

এখন শুধু দুজনেরই অপেক্ষা—এই মাস শেষ হয়ে আগামী মাস কবে আসবে?


পর্ব: ০৮ — শেষ পর্ব

অবশেষে সব ঝামেলা শেষ।

দাদি জেরিনের বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে আগামী মাসের ১৩ই জ্যৈষ্ঠ বিয়ে ঠিক করলেন।

আমি আর জেরিন তো খুশিতে আত্মহারা।

আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। আমাদের বহু প্রতীক্ষিত মিলনের রাত কাছে চলে এসেছে।

আমার শ্বশুরের মত অনুযায়ী দাদি সিদ্ধান্ত নিলেন, ঢাকার ধানমন্ডিতে একটি কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ে হবে।

যেহেতু আমার শ্বশুরের আত্মীয়স্বজন সেখানে আছে, তাই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।

আমার মত জানতে চাইলে আমি দাদিকে বললাম,

—আপনাদের মত যা হয় করেন। আমিতো আর এক মুহূর্তও জেরিনকে ছাড়া থাকতে পারছি না।

প্রতিদিন জেরিনের সঙ্গে কথা বলি, মেসেজও হয়।

তবুও জেরিনকে কাছে পেতে মন সর্বদা বিভোর থাকে।

জেরিনও আমার বিরহে কাতরাচ্ছে দিনরাত।

আর মাত্র তিন দিন বাকি আমাদের মিলনের।

কাল আগামীকাল সকালে বাবা-মা আর জেরিন চলে আসবে ঢাকায়।

পরশু আমাদের অনুষ্ঠান।

আমি জেরিনের সঙ্গে কথা বলে ওর পছন্দ-অপছন্দ, চাওয়া-পাওয়া সব জেনে নিলাম।

জেরিনও খুব মায়া জড়ানো কণ্ঠে বলল,

—তোমার কাছে আর কী চাইব আমি?

আমাকে একটা চাঁদনি রাতের চাঁদের আলোতে তোমার বুকে নিয়ে বারান্দায় বসে আকাশ দেখো।

জোনাকির আলোতে, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে তোমার সঙ্গে রেখো।

রাতভর তোমার সঙ্গে গল্প করে কাটিয়ে দেব।

তোমার সব চাওয়া-পাওয়াগুলো পূরণ করে দেব আমি।

শিশিরভেজা কোনো এক স্নিগ্ধ সকালে পাখির কিচিরমিচির ডাকের সঙ্গে এক কাপ চা নিয়ে তোমার ঘুম ভেঙে দেব।

সূর্যটাকে ডেকে এনে জানালার পর্দা সরিয়ে তোমার ঘুমন্ত চোখে তার আলো ছড়াব।

এটাই তো আমার চাওয়া।

জেরিনের কথাগুলো শুনে আমি নিজেকে আর চিনতে পারছি না।

কল্পনার জগতে হারিয়ে যাচ্ছি আমি হাজার স্বপ্নের ভিড়ে।

আমি আব্বু-আম্মুর সঙ্গেও কথা বললাম।

কাল সকালে লঞ্চঘাট থেকে ওদের নিয়ে সোজা মার্কেটে যাব বিয়ের শপিং করতে।

সবাই রাজি হলো।

জেরিনকে আমি বারবার ফোন করছি আর জেরিন আমার উদাস মনটাকে কালকের কথা বলে সান্ত্বনা দিচ্ছিল।

রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছি, কখন সকাল হবে?

পৃথিবী ঘুমিয়ে গেছে। ঘুমের সাধ্য হচ্ছে না আমাকে ঘুম পাড়াতে।

আমি মাতাল হয়ে আছি আমার জেরিনকে নিয়ে।

ভাবতে ভাবতে একটু ঘুমিয়েছিলাম।

কিন্তু ভোরের মুয়াজ্জিনের মধুর আজানে জেগে গেলাম।

গ্রামের বাড়ির খামারে হাঁস-মুরগিগুলো হয়তো তাদের ডাকে ভাসিয়ে দিচ্ছে অন্ধকারকে।

পাখিরা ঘুম থেকে উঠে প্রকৃতিকে আহ্বান করছে।

সূর্যটাও পূর্বদিক রঙিন করে জানিয়ে দিচ্ছে—আমি এখনই আসছি।

আমি নামাজ পড়ে এক কাপ কফি নিয়ে ছাদে এলাম।

ছাদে এসে দেখি, সূর্যটা পাহাড়ের ফাঁকে উঁকি দিয়েছে।

আমি জেরিনকে ফোন করলাম।

কিন্তু ফোন আম্মু রিসিভ করলেন।

বললেন,

—আমরা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাব। এখন চাঁদপুরের কাছাকাছি আছি। সামনে মেঘনা নদীর মোড়টা পেরিয়েই ঢাকায় ঢুকবে আমাদের লঞ্চ।

জেরিনের কথা জিজ্ঞেস করতেই আম্মু বললেন,

—জেরিন কাল সারা রাত একটুও ঘুমায়নি। লঞ্চের ছাদে বসে ছিল। এখনো কারও সঙ্গে কিছু বলছে না।

আমি ছাদ থেকে নেমে দেখি, দাদি এখনো জায়নামাজে বসে আছেন।

কাজের মেয়েটা এসে আমাকে নাস্তা করতে বলল।

আমি বললাম,

—আমি এখন করব না।

সে হেসে বলল,

—আপা আসলে একসঙ্গে করবেন?

আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললাম,

—জেরিনকে ছাড়া কিছু খেতে ইচ্ছা করছে না রে!

কাজের মেয়েটা বলল,

—আপনে গিয়ে তাড়াতাড়ি আপারে নিয়ে আসেন। আমি বাড়িঘর সাজিয়ে রাখছি।

আমি ওকে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিয়ে দাদির কাছে গেলাম।

দাদি আমাকে দেখে বললেন,

—নাস্তা করে গাড়ি নিয়ে সদরঘাট চলে যা। জেরিন আর ওর আব্বু-আম্মুকে রিসিভ করতে হবে।

আমি বললাম,

—ওখান থেকেই শপিং করে আসব।

দাদি অনুমতি দিয়ে দিলেন।

আমি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

যেতে যেতে কয়েকবার জেরিনকে ফোন করলাম, কিন্তু জেরিন ফোন তুলছে না।

ভাবছি, আজ জেরিন আমার সঙ্গে কথা বলছে না—রহস্য কী?

পরে আবার ভাবলাম, জেরিন হয়তো আমাকে সারপ্রাইজ দিতে চায়। তাই আজ কথা বলবে না।

আমিও একটু পরে দেখা পাব আমার জেরিনের—এই আশাতেই মনকে সান্ত্বনা দিলাম।

ঢাকায় ঢুকেই জ্যামে আটকে গেলাম।

অনেক কষ্টে অল্প অল্প করে এগিয়ে যাচ্ছি।

পথে থেমে থেমে কয়েকবার ফোন দিলাম, কিন্তু ফোন তুলছে না।

আমার মন অজানা এক ভয়ে কেঁপে উঠল।

এমন তো আর হয়নি!

কল ঢুকছে না কেন?

তবুও ভাবলাম, হয়তো নেটওয়ার্ক সমস্যা।

আমার ভাবনার মাঝে গভীরতা বেড়ে গেল।

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘাটে গেলাম।

দুপুর ১১টার দিকে ঘাটে পৌঁছালাম।

ঘাটে গিয়ে এমন সংবাদ শুনব, আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।

‘থ’ হয়ে থেমে গেলাম।

মনে হলো, আকাশের এক চতুর্থাংশ আমার মাথার ওপর ভেঙে পড়েছে।

আকাশের পাখিরাও তাদের গুঞ্জন বন্ধ করে দিয়েছে।

সূর্য থেকেও হয়তো তার প্রখর উত্তাপে তপ্ত পানি ঝরে পড়ছে এই আকস্মিক সংবাদে।

আমার কান একথা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না।

সাগরের পানির উচ্চ চাপের কারণে মেঘনা নদীর মোহনায় বরিশাল থেকে আসার পথে একটি লঞ্চ ডুবে গেছে।

ঢেউয়ের চাপ এত প্রকট যে কোনো নৌযান উদ্ধারকাজেও যেতে পারছে না।

আমি কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।

একটা চিৎকার দিয়ে গাড়িতেই জীবন্ত পাথুরে মূর্তির মতো বসে আছি।

আমার কোনো জ্ঞান নেই।

কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম জানি না।

দুপুর ২টার দিকে দাদি ফোন করলেন।

আমি খেয়াল করলাম, ঘাটের একটি কেবিনে শুয়ে আছি।

দাদির ফোন রিসিভ করতেই ওপার থেকে দাদির কণ্ঠে ভেসে এলো,

—কিরে, এখনো আসছিস না যে? জেরিন কোথায়? ফোন ঢুকছে না কেন? কী হয়েছে? কোনো সমস্যা?

আমি নিশ্চুপ।

ফোনটা কেটে দিলাম।

পৃথিবীটাকে খুব দুর্বিষহ মনে হচ্ছে।

ইচ্ছা করছে, নিজের দেহটাকেও এই হিংস্র, রাক্ষুসী নদীর কাছে বিলিয়ে দিই।

আমার চিন্তা-ভাবনার মাঝে শুধু জেরিন।

মনে হচ্ছে, এই তো জেরিন চলে এসেছে। আমাকে ডাকছে ওর মায়া জড়ানো কণ্ঠে।

জেরিন হয়তো এই মানুষগুলোর মাঝে একা চলতে ভয় পাচ্ছে। তাই আমার হাতটা ধরে ছুটে চলতে চাইছে।

এত মানুষের ভিড়ে নিজেকে এক অপরাধী, একা মনে হচ্ছে।

মনটাকে একটু শান্ত করতে পাশেই নামাজের কক্ষে নামাজ পড়ে নিলাম।

কান্নায় বুক ভেসে যাচ্ছে জেরিনের জন্য।

ভাগ্যটাকে বড় অসহায় মনে হচ্ছে।

বাবা-মায়ের আদর-স্নেহহীন জীবনে আর কারও ভালোবাসা পাওয়া কপালে জুটল না।

আমার জেরিন এভাবে হারিয়ে যাবে—এও কি সম্ভব?

নামাজ শেষে লঞ্চ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম।

কর্তৃপক্ষের কথায় আশার আর কোনো পথ নেই।

কাউকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। কিছু লাশ পাওয়া গেছে, তবে বেশির ভাগই নিখোঁজ।

শেষবার জেরিনকে দেখতে পাওয়ার যে আশা বুকে জমেছিল, তাও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল কাঁচের টুকরোর মতো।

আমি আবার ধৈর্যহারা হয়ে গেলাম।

এই পৃথিবীর বুকে জেরিনকে ছাড়া রবিন বেঁচে থাকবে?

নিজের পরিণতি নিয়ে চিন্তিত হলাম।

নিজেকে খানিকটা সান্ত্বনা দিয়ে লঞ্চের ডেকে গেলাম।

ডেকে স্বজনদের বাঁধভাঙা ভিড় আর হৃদয়বিদারক চিৎকার।

মায়ের জন্য শিশুর আহাজারি।

আমার মতো কতজন প্রিয়জন হারানোর ব্যথায় হাহাকার করছে, কে জানে?

আমি ভিড় ঠেলে অনেক কষ্টে ভেতরে গেলাম।

প্রায় ৩৫ জনের লাশের একটি সারি।

আমি চোখ বন্ধ করে ফেলেছি।

চোখ খুলে লাশের সারিটা দেখব, কিন্তু সাহস হচ্ছে না।

অনেক কষ্টে বুকে পাথর চেপে চোখটা খুলে প্রথম লাশের দিকে তাকাতেই বুকটা চিরে ‘মা’ বলে একটা চিৎকার বেরিয়ে এলো।

আশপাশে স্বজনদের জন্য আহাজারি করা মানুষদের মধ্যে আমার চিৎকারটাও বিলীন হলো।

সারির প্রথম লাশটাই আমার শাশুড়ি আম্মুর।

যিনি ছেলে ভেবেই বুকে টেনে নিয়েছিলেন আমাকে।

আম্মুর লাশের দিকে এতিম হয়ে তাকিয়ে আছি।

মায়াবী মুখটার বাঁ গালের ওপরের কালো তিলটা আম্মুর স্মৃতি বহন করছে।

হয়তো আমাকে মুখ খুলে কিছু বলতে চাইছেন।

বলতে চাইছেন,

“আমার জেরিনকে একটু দেখে রেখো বাবা।”

কিন্তু কথা বলার শক্তি কেউ তাঁর কাছ থেকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে একেবারে শান্ত করে দিয়েছে জলজ্যান্ত দেহটাকে।

অন্য লাশের মধ্যে আমার জেরিন আর শ্বশুর মশাইকে খুঁজে পেলাম না।

জেরিনের লাশটা দেখার যে তীব্র ইচ্ছা ছিল, তা ক্রমেই মাটিচাপা পড়ে যাচ্ছে লাশের ভিড়ে।

লঞ্চ কর্তৃপক্ষ বলল,

—এখনো অনেক লাশ নিখোঁজ আছে।

ইচ্ছা না থাকলেও বিশ্বাস করতে হলো—নিখোঁজদের মধ্যে আমার জেরিন আর ওর বাবাও একজন।

লঞ্চ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লাশ শনাক্ত করে অ্যাম্বুলেন্সে করে আম্মুকে নিয়ে গেলাম আমাদের বাসায়।

দাদি একেবারে নিশ্চুপ বসে রইলেন।

শুধু দু-চোখ দিয়ে ঝরনার মতো তপ্ত লবণাক্ত পানি নিঃসৃত হচ্ছে।

খুব ভেঙে পড়লেন তিনি।

যেই মনে সকাল থেকে বসে ছিলেন নতুন বধূবরণ করবেন, আনন্দে মেতে থাকবেন—সেখানে লাশ গ্রহণ করতে হচ্ছে এক বুক ব্যথা নিয়ে।

জেরিনের আম্মুকে দেখে দাদি অঝোরে কাঁদতে লাগলেন।

আমার দাদি দেশের বাড়িতে থাকতে জেরিনের আম্মুর সঙ্গে অন্তরঙ্গ মায়ায় ছিলেন।

জেরিনকে পছন্দ করার অন্যতম কারণ এটাই ছিল—দাদি জেরিনের আম্মুকে নিজের মেয়ের মতো দেখতেন।

আমিও আমার জেরিনের জন্য শপিং করার পরিবর্তে জেরিনের আম্মুর জন্য কাফনের কাপড় কিনে আনলাম।

আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে আম্মুকে কবর দেওয়া হলো।

আমার বাবা-মায়ের ঠিক বাম পাশে।

আমি প্রতিদিন যখন কবরের পাশে আসি, তখন দেখি দাদি কবরের পাশে বসে আছেন।

একদিন দাদি আমাকে দাদার কবরের পাশে একটু খালি জায়গা দেখিয়ে বললেন,

—আমার মৃত্যুর পরে এই জায়গাটায় আমাকে কবর দিস, দাদু ভাই।

আমি দাদিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম।

কিছু বলতে পারছিলাম না।

আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু চোখের সাগরকে খালি করছিলাম।

আর দুঃখভরা এই জীবনের কল্পনাগুলো নিয়ে ভাবছিলাম—

নিষ্ঠুর পৃথিবীটা কেন স্বপ্নগুলোকে এভাবে কেড়ে নেয়?

কেন আপনজন হারানোর ব্যথা সহ্য করা যায় না?

কেন আমি জেরিনকে হারালাম?

এত কাছে পেয়েও কেন জেরিনকে আগলে রাখতে পারলাম না?

কেন জেরিনকে আরও আগে আপন করে নিলাম না?

সব প্রশ্নগুলো বুকে কাঁটার মতো বিদ্ধ হচ্ছে।

আর কবরস্থানের দিকে তাকিয়ে ভাবছি দাদা-দাদির কবরের ঠিক পায়ের দিকের খালি জায়গাটার কথা।

হয়তো এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে ধ্বংসস্তূপের মাঝে বেঁচে থাকা এই একা ছেলেটার শেষ ঠিকানাটা এখানেই করে দিতে হবে।

সমাপ্ত

নোট: আরও বাংলা গল্প ও সাহিত্যভিত্তিক লেখা পড়তে "আমাদের সাহিত্য বিভাগে" ভিজিট করুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "মেঘনা নদীর মোহনায় | হৃদয়স্পর্শী বাংলা প্রেমের গল্প | আল আব্বাস রবিন "