Widget HTML #1

রাতকানা বউ – হৃদয়স্পর্শী প্রেমের গল্প | আল আব্বাস রবিন

বিষয়সূচি

রাতকানা বউ একটি আবেগঘন ও হৃদয়স্পর্শী প্রেমের গল্প। গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র রবিন ও জেরিন। বিয়ের পর একে অপরকে ভালোবেসে তাদের ছোট্ট সংসার যখন ভালোবাসা, বিশ্বাস ও ধর্মীয় মূল্যবোধে পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে, ঠিক তখনই জেরিনের চোখে ধরা পড়ে ভয়াবহ এক সমস্যা।

যে চোখের প্রেমে পড়ে রবিন তার স্ত্রীকে ভালোবেসেছিল, সেই চোখই একসময় হারাতে শুরু করে আলো। চিকিৎসা, অপেক্ষা, ভয়, দোয়া এবং ভালোবাসার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় তাদের জীবনের কঠিন সময়।

ভালোবাসা কি শুধু সুস্থ-সুন্দর সময়ের জন্য? নাকি সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষের সবচেয়ে কঠিন সময়েও পাশে থাকে?

জানতে পড়ুন আল আব্বাস রবিনের হৃদয়স্পর্শী গল্প “রাতকানা বউ”

রাতকানা বউ বাংলা গল্পের প্রচ্ছদ – লেখক আল আব্বাস রবিন
রাতকানা বউ — আল আব্বাস রবিনের লেখা একটি বাংলা গল্প


রাতকানা বউ

একটি আবেগঘন ও হৃদয়স্পর্শী প্রেমের গল্প
গল্পের লেখক: আল আব্বাস রবিন
(সকল পর্ব একত্রে)

গল্পের শুরু

রাত তখন খুব বেশি হয়নি। চারপাশে নীরবতা নেমে এসেছে। অথচ আমার মনের ভেতর তখন হাজারো প্রশ্নের ভিড়।

প্রায় তিন বছর ধরে পরিবারের পক্ষ থেকে আমার জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছিল। অনেক জায়গায় খোঁজ নেওয়া হয়েছে, অনেক পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই বিয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত হচ্ছিল না।

অবশেষে একদিন আমাদের গ্রামেরই একটি মেয়ের কথা উঠল। মেয়েটির নাম জেরিন

পরিবারের সবাই মেয়েটিকে পছন্দ করল। আমিও পরিবারের সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখলাম। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বিয়ের আগে আমি জেরিনকে কখনো সরাসরি দেখিনি।

সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের বিয়ের দিন চলে এলো।

বিয়ের দিন

বিয়ের দিনটিতে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু আরফাত আমার পাশে ছিল।

আমি স্বভাবগতভাবেই কিছুটা লাজুক। তার ওপর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। মনে হচ্ছিল, চারপাশের সবাই আমাকে দেখছে আর আমি যেন নিজেকেই সামলাতে পারছি না।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো।

মাগরিবের নামাজের পর অবশেষে সেই মুহূর্ত এলো—যে মুহূর্তে আমি প্রথমবার আমার স্ত্রীকে কাছ থেকে দেখব।

জেরিন ঘোমটা দিয়ে বসে ছিল।

আমি ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালাম।

প্রথম দেখাতেই আমার চোখ আটকে গেল তার চোখের দিকে।

কী অদ্ভুত সুন্দর চোখ!

মনে হলো, এতদিন যে মানুষটির সঙ্গে দেখা হয়নি, সেই মানুষটিই যেন বহুদিন ধরে আমার জীবনের কোনো এক অদৃশ্য গল্পের অংশ হয়ে ছিল।

আমি কিছু বলার আগেই জেরিন মৃদু স্বরে বলল,

—আপনি কি আমাকে আগে কখনো দেখেছেন?

আমি মাথা নাড়লাম।

—না।

সে একটু হেসে বলল,

—কিন্তু আমি আপনাকে আগে দেখেছি।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

—কোথায়?

জেরিন বলল,

—আপনার ছবি দেখেছি।

আমি লজ্জায় কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।

জেরিনের ভালোবাসার কথা

সেদিন রাতে আমাদের মধ্যে অনেক কথা হলো।

জেরিন জানাল, বিয়ের আগে থেকেই সে আমার সম্পর্কে কিছুটা জানত। আমার ছবি দেখেছিল এবং মনে মনে আমাকে পছন্দও করেছিল।

তার কথা শুনে আমার ভেতরে অদ্ভুত এক ভালো লাগা তৈরি হলো।

আমি বুঝতে পারলাম, আমাদের পরিচয়টা হয়তো হঠাৎ করে হয়নি। আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়তো এতদিন পর আমাদের দেখা হয়েছে।

বিয়ের পর আমাদের ছোট্ট সংসার ধীরে ধীরে ভালোবাসায় ভরে উঠতে লাগল।

আমরা একসঙ্গে নামাজ পড়তাম, কুরআন পড়তাম, বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতাম। অবসর সময়ে গল্প ও উপন্যাস পড়তাম।

জেরিন বই পড়তে খুব ভালোবাসত।

তার সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোর মধ্যে একটি ছিল ‘আঁধার রাতের বন্দিনী’। বইটির পাঁচটি খণ্ডই সে পড়েছিল।

আমিও বইটি পড়েছি।

জেরিন যখন জানতে পারল, আমি বইটি আটবার পড়েছি, তখন সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল,

—আপনি সত্যিই আটবার পড়েছেন?

আমি হেসে বলেছিলাম,

—হ্যাঁ।

সেই মুহূর্তগুলো আজও আমার মনে পড়ে।

জেরিনের গোপন কথা

আমাদের বিয়ের কিছুদিন পর একদিন জেরিন আমাকে বলল,

—আপনাকে একটা কথা বলব?

আমি বললাম,

—বলুন।

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমার চোখে একটু সমস্যা আছে।

আমি অবাক হলাম।

—কী সমস্যা?

সে বলল,

—অনেকদিন ধরেই চোখে সমস্যা হচ্ছে। খুব বেশি নয়। তবে মাঝে মাঝে দেখতে অসুবিধা হয়।

আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম,

—এটা নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই। ডাক্তার দেখাব। সব ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

জেরিনের চোখে তখন পানি।

সে বলল,

—আমি ভয় পেয়েছিলাম, আপনি যদি আমাকে গ্রহণ না করেন!

আমি তার হাত ধরে বললাম,

—তুমি আমার স্ত্রী। তোমার কোনো সমস্যা হলে সেটা শুধু তোমার সমস্যা নয়, আমাদের দুজনের সমস্যা।

জেরিন আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

সেই হাসির মধ্যে যেন অনেকটা স্বস্তি ছিল।

ভালোবাসার দিনগুলো

সময় নিজের গতিতে এগিয়ে চলল।

আমাদের সংসারে সুখের মুহূর্ত বাড়তে লাগল।

কখনো আমরা একসঙ্গে বই পড়তাম, কখনো পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতাম। কখনো ছোটখাটো বিষয় নিয়ে হাসাহাসি করতাম।

জেরিনের চোখের সমস্যাটিও তখন খুব বেশি গুরুতর মনে হচ্ছিল না।

কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল।

তার চোখের সমস্যা বাড়তে লাগল। আগের মতো পরিষ্কারভাবে দেখতে পারত না। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে তার দেখতে আরও বেশি অসুবিধা হতো।

আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম।

অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম, তাকে ভালো কোনো চক্ষু চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাব।

নোট: আরও একটি হৃদয়স্পর্শী মানবিক গল্প পড়ুন — পথশিশুর ইফতার

চক্ষু হাসপাতালে

একদিন আমরা চট্টগ্রামের একটি চক্ষু হাসপাতালে গেলাম।

বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক আমাদের সঙ্গে কথা বললেন।

প্রাথমিকভাবে তিনি বললেন, বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত পরীক্ষা প্রয়োজন।

পরবর্তী পরীক্ষার পর চিকিৎসক আমাকে আলাদাভাবে ডেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বললেন।

আমি বুঝতে পারলাম, বিষয়টি যতটা সহজ ভেবেছিলাম, আসলে ততটা সহজ নয়।

চিকিৎসক জানালেন, জেরিনের চোখের অবস্থা ধীরে ধীরে অবনতি হচ্ছে। তার দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করার জন্য বিশেষ চিকিৎসা এবং প্রয়োজনে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

কথাগুলো শুনে আমার মাথা যেন ঘুরে গেল।

আমি ভাবতেই পারছিলাম না—যে চোখের দিকে তাকিয়ে আমি প্রথমবার জেরিনকে ভালোবেসেছিলাম, সেই চোখই একদিন হয়তো আলো হারাতে পারে।

সত্য জানার পর জেরিন

জেরিনও ধীরে ধীরে সবকিছু জানতে পারল।

আমি ভেবেছিলাম, সে হয়তো ভেঙে পড়বে।

কিন্তু সে আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল,

—আল্লাহ যা করেন, নিশ্চয়ই ভালো কিছুই করেন।

আমি বললাম,

—কিন্তু তুমি ভয় পাচ্ছ না?

সে মৃদু হেসে বলল,

—ভয় তো লাগছে। তবে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলে ভয়টা অনেকটাই কমে যায়।

তার কথা শুনে আমার চোখে পানি চলে এলো।

আমি মনে মনে বললাম,

“হে আল্লাহ, আমার জেরিনকে সুস্থ করে দাও।”

ভালোবাসার পরীক্ষা

জেরিনের চিকিৎসা চলতে থাকল।

একসময় চিকিৎসক জানালেন, উপযুক্ত একজন দাতার সন্ধান পাওয়া গেছে এবং তার চোখের চিকিৎসার জন্য একটি অস্ত্রোপচারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

খবরটি শুনে আমরা যেমন আশাবাদী হলাম, তেমনি ভয়ও পেলাম।

কারণ বড় ধরনের অস্ত্রোপচার সবসময়ই ঝুঁকিমুক্ত নয়।

জেরিন বলল,

—আপনি কি আমার জন্য ভয় পাচ্ছেন?

আমি বললাম,

—হ্যাঁ।

সে আমার হাত ধরে বলল,

—আপনি শুধু আমার পাশে থাকবেন।

আমি বললাম,

—শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত থাকব।

অপারেশনের সিদ্ধান্ত

অবশেষে অস্ত্রোপচারের দিন ঠিক হলো।

জেরিনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো।

হাসপাতালের সেই সাদা দেয়াল, চারপাশের নীরবতা আর চিকিৎসকদের ব্যস্ততা—সবকিছু আমার কাছে অস্বস্তিকর লাগছিল।

মনে হচ্ছিল, সময় যেন থেমে গেছে।

অস্ত্রোপচারের আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে আমাকে স্বাক্ষর করতে হলো।

কলমটি হাতে নিয়েও আমার হাত কাঁপছিল।

আমি জানতাম, জেরিনকে সুস্থ করার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

তবুও মনে হচ্ছিল, আমি যেন নিজের হৃদয়ের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে একটি কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছি।

অপারেশনের আগের মুহূর্ত

অস্ত্রোপচারের আগে জেরিন আমাকে ডেকে বলল,

—একটা কথা রাখবেন?

আমি বললাম,

—কী কথা?

সে বলল,

—যদি আমার কিছু হয়ে যায়, আপনি ধৈর্য ধরবেন।

আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

বললাম,

—এমন কথা বলো না।

জেরিন মৃদু হেসে বলল,

—জীবন-মৃত্যু আমাদের হাতে নেই। সবকিছু আল্লাহর হাতে।

আমি তার হাত শক্ত করে ধরে বললাম,

—তুমি ফিরে আসবে। ইনশাআল্লাহ।

সে চোখ বন্ধ করে বলল,

—ইনশাআল্লাহ।

নোট: আরও একটি ছোট গল্প পড়ুন — সেকেন্ডহ্যান্ড

শেষ অপেক্ষা

জেরিনকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

আমি বাইরে বসে রইলাম।

একেকটি মিনিট যেন একেকটি বছরের মতো লাগছিল।

আমি কখনো দোয়া করছিলাম, কখনো দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকছিলাম।

মনে হচ্ছিল, আমার জীবনের সব সুখ-দুঃখ যেন এই একটি দরজার ওপারে আটকে আছে।

অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার পর চিকিৎসকরা বেরিয়ে এলেন।

আমি দ্রুত উঠে দাঁড়ালাম।

কিন্তু চিকিৎসকের মুখের অভিব্যক্তি দেখে আমার বুক কেঁপে উঠল।

করুণ পরিণতি

চিকিৎসক ধীরে ধীরে জানালেন, অস্ত্রোপচারের সময় জেরিন গুরুতর শারীরিক জটিলতায় পড়েছিল।

তার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে যায়।

চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

আমি কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলাম না।

মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব শব্দ হঠাৎ করে থেমে গেছে।

যে মানুষটি কিছুক্ষণ আগেও আমার সঙ্গে কথা বলছিল, সে আর কখনো আমার সঙ্গে কথা বলবে না।

আমি ধীরে ধীরে জেরিনের কাছে গেলাম।

সাদা কাপড়ের নিচে নিথর হয়ে শুয়ে আছে আমার জেরিন।

আমি শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

মনে পড়ছিল আমাদের প্রথম দেখা।

মনে পড়ছিল তার চোখ দুটো।

মনে পড়ছিল তার হাসি।

মনে পড়ছিল তার বলা সেই কথাটি—

“জীবন-মৃত্যু আমাদের হাতে নেই। সবকিছু আল্লাহর হাতে।”

আজ সত্যিই সে আমার হাতের বাইরে চলে গেছে।

রাতকানা বউ

জেরিনের চোখের চিকিৎসার জন্য যে লড়াই শুরু হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই লড়াই আমাদের ভালোবাসার গল্পকে অন্য এক পরিণতির দিকে নিয়ে গেল।

যে চোখের প্রেমে পড়ে আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবেসেছিলাম, সেই চোখের স্মৃতিই এখন আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান।

আমি শুধু তাকিয়ে আছি জেরিনের দিকে।

কিন্তু জেরিন আর কোনোদিন ফিরে তাকাবে না আমার দিকে।

কিছু মানুষ জীবনে খুব অল্প সময়ের জন্য আসে।

কিন্তু সেই অল্প সময়ের মধ্যেই তারা হৃদয়ের এত গভীরে জায়গা করে নেয় যে, তাদের অনুপস্থিতিও সারাজীবন অনুভব করা যায়।

জেরিনও তেমনই একজন।

সে হয়তো আর নেই, কিন্তু তার ভালোবাসা, তার কথা, তার হাসি আর তার চোখ—সবকিছুই আমার স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে।

আমি শুধু দেখছি জেরিনের দিকে, কিন্তু জেরিন আর দেখবে না আমার দিকে ফিরে।

সমাপ্ত

নোট: আরও বাংলা গল্প ও সাহিত্যধর্মী লেখা পড়তে আমাদের সাহিত্য বিভাগে ঘুরে দেখুন।


রাতকানা বউ
হৃদয়স্পর্শী প্রেমের গল্প
লেখক: আল আব্বাস রবিন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "রাতকানা বউ – হৃদয়স্পর্শী প্রেমের গল্প | আল আব্বাস রবিন"