Widget HTML #1

১৯৬৯ এবং ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের তুলনামূলক আলোচনা

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বেচ্ছাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পতনের এক অগ্নিগর্ভ আন্দোলন। তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল নয় বছরের স্বৈরাচারী সামরিক সরকারের পতন ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার এক দুর্বার আন্দোলন। এই দুটি আন্দোলনের উদ্ভব ও বিকাশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় এবং দুটি আন্দোলনই ছিল সফল ও তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৬৯ ও ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা এখানে আমাদের আলোচ্য বিষয়।

Comparative discussion of the mass uprisings of 1969 and 1990
১৯৬৯ এবং ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের তুলনামূলক আলোচনা

১৯৬৯ ও ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের তুলনামূলক আলোচনা 

পাকিস্তান ও বাংলাদেশে স্বৈরাচারী সামরিক সরকারের উচ্ছেদ এবং জনগণের মৌলিক মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যথাক্রমে ১৯৬৯ ও ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান অত্যন্ত আলোড়িত ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এই দুই রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের তুলনামূলক আলোচনা নিম্নে প্রদত্ত হলো।

১. রাজনৈতিক সাদৃশ্য

১৯৬৯ ও ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে রাজনৈতিক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ক্ষমতাসীন সরকার প্রতিক্রিয়াশীল নীতির আশ্রয় গ্রহণ করলেও সামরিক বাহিনীর আশ্রয় গ্রহণ করে নি। তবে ১৯৫৮ সালে ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানের সংসদীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে সামরিক শাসন জারি করেন এবং জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। আইয়ুব, খান সুযোগ বুঝে ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর পাকিস্তানের সংবিধান ও জাতীয় সংসদ বাতিল করেন এবং ইস্কান্দার মির্জাকে অপসারিত করে তিনি নিজে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের ক্ষমতাকে সুসংহত করার জন্য আইয়ুব খান গণতন্ত্রের নামে মৌলিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালান। তিনি প্রেসিডেন্ট থেকে গ্রাম্য পর্যায় পর্যন্ত মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচন করেন যারা ছিল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তার অনুগত। এ সকল মৌলিক গণতন্ত্রীর ভোটে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে গণতন্ত্রের নামে স্বেচ্ছাতন্ত্র কায়েম করতে তৎপর হন। সকল প্রকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর নিষেধাজ্ঞা, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি সর্বপ্রকার বৈষম্যমূলক নীতি এবং প্রতিপক্ষীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে জেল-জুলুম অব্যাহত রাখেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালের সফল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে আইয়ুব খান ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হন।

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত হন

অন্যদিকে ১৯৮২ সালে তৎকালীন সামরিক বাহিনী প্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিএনপির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের নিকট থেকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে দেশে সামরিক শাসন কায়েম করেন। নিজ ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য এরশাদ 'জাতীয় পার্টি' প্রতিষ্ঠা করে গণতন্ত্রের নামে একদলীয় স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেন। নির্বাচনের নামে ভোট ডাকাতি এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন বয়কট উপেক্ষা করেও তিনি ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী সর্বস্তরের জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ও অনেক আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হন। এক্ষেত্রে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে যেমন সমগ্র পাকিস্তানে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল তেমনি বাংলাদেশে ২২ দলীয় ঐক্যজোটের যুগপৎ আন্দোলনের কাছে এরশাদ সরকারের পতন অবধারিত হয়েছিল।

২. অর্থনৈতিক সাদৃশ্য

১৯৬৯ ও ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে অর্থনৈতিক সাদৃশ্য বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। ১৯৫৫-১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের গৃহীত পরিকল্পনায় এই বৈষম্য ধরা পড়ে। প্রথম পরিকল্পনায় সমস্ত বিনিয়োগের মাত্র ২৬% ছিল পূর্ব পাকিস্তানে, ২য় ও ৩য় পরিকল্পনায় দেখা যায় বিনিয়োগ ছিল যথাক্রমে ৩২% ও ৩৬% আবার ১৯৬৪-১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে রাজস্ব ও উন্নয়ন খাতে মাথাপিছু ব্যয় হয়েছিল যথাক্রমে ৭০ ও ২৪০ টাকা। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে এর পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৩৯০ ও ৫২১ টাকা। উপরন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি প্রভৃতি ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানিদের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি দেশের জনগণকে বিক্ষুব্ধ করেছিল। আর এই বিক্ষুব্ধতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলে আমলা ও চাটুকার রাজনীতিবিদরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়ে উঠে। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক-বীমা, উন্নয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে দলীয় লোকদের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। ঘুষ, দুর্নীতি ও লুটপাট নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়। উপরন্ত বিরাষ্ট্রীয়করণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এরশাদ যেমন দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করেন তেমনি ব্যক্তিগত লুটপাটের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। আইয়ুব খান যেমন গ্রাম্য পর্যায়ে মৌলিক গণতন্ত্রীদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেছিলেন তেমনি এরশাদের সময়ে রেশনের ডিলারি তার দলীয় লোকদের একচেটিয়া ছিল। এর ফলে একশ্রেণীর লোক অবৈধ অর্থ উপার্জন করে আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়ে উঠে। এই অর্থনৈতিক বিক্ষুব্ধতা জনগণের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে মধ্য দিয়ে।

৩. আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সাদৃশ্য

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধ গড়ে উঠে পরবর্তীতে তা আরো শাণিত হয়ে ৬ দফা আন্দোলনের স্রোতধারায় মিলিত হয়। ৬ দফা ছিল পূর্ব পাকিস্তানিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এক মূলমন্ত্র। এই ৬ দফাভিত্তিক আন্দোলনের গতিধারা ও ছাত্রসমাজের ১১ দফাভিত্তিক আন্দোলনের গতিধারার গন্তব্য ছিল ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান। অন্যদিকে এরশাদের শাসনামলে গণতন্ত্রের নামে চলে সামরিকতন্ত্র। মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার হয়ে উঠে দলীয় গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ। দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসনের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসার জন্য গড়ে উঠে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন, গঠিত হয় ২২ দলীয় ঐক্যজোট এবং যুগপৎ আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালে পতন ঘটে এরশাদ সরকারের সামরিক শাসনের।

৪. সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের সাদৃশ্য

 জেনারেল আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সামাজিক ক্ষেত্রে একটি শোষক, উৎপীড়ক ও টাউট শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটে। ১৯৬০ সালের ১১ জানুয়ারি সমগ্র পাকিস্তানে (পূর্ব পাকিস্তানে ৪০ হাজার ও পশ্চিম পাকিস্তানে ৪০ হাজার) সর্বমোট ৮০হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচিত হয়। এ সকল মৌলিক গণতন্ত্রী সামাজিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অন্যান্য সামাজিক অনাচার দ্বারা সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে।

অন্যদিকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পরিষদ গঠন ও উভয় ক্ষেত্রে নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক শোষক, টাউট ও দুর্নীতিবাজ শ্রেণী তৈরি করে। সামাজিক বিশৃঙ্খলা, শোষণ এবং সামাজিক অবক্ষয় ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে এ সকল প্রয়াস বহুল ভূমিকা পালন করে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জনগণ উভয়বিধ গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করে।

৫. আদর্শচ্যুতির সাদৃশ্য

১৯৬৯ ও ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পশ্চাতে সরকারের আদর্শচ্যুতির বিষয়টি প্রতিভাত হয়ে উঠে। জনকল্যাণ ও জনগণের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্রী সৃষ্টি করে স্বীয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার প্রয়াস পান। এ সকল মৌলিক গণতন্ত্রীকে বশীভূত করে তিনি ১৯৬৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করে স্বৈরশাসনের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করেন।

পক্ষান্তরে এরশাদ জেলা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে নিজস্ব ক্যাডার ও সমর্থক সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করেন। এ সকল স্থানীয় প্রতিনিধি জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে পেশিশক্তি ব্যবহার করে এবং ভোট কারচুপি ও অবৈধ ভোটের মাধ্যমে নামমাত্র নির্বাচনে এরশাদের জয়লাভের পথ প্রশস্ত করে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে আদর্শচ্যুতির ফলে আইয়ুব ও এরশাদ সরকার জনগণের রোষানলে নিপতিত হয় এবং ১৯৬৯ ও ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তারা উভয়েই ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হন।


শেষ কথাঃ

পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলা তথা উপমহাদেশের আন্দোলনের গতিধারায় ১৯৬৯ ও ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে এবং থাকবে। উভয় অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচারের কবল থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্তকরণ এবং জনগণের গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত উভয়বিধ গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে যেমন সাদৃশ্য লক্ষ করা যায় তেমনি উভয় অভ্যুত্থানই সফল হয়। সুতরাং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ১৯৬৯ ও ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত হন

Post a Comment for "১৯৬৯ এবং ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের তুলনামূলক আলোচনা"