Widget HTML #1

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস, পটভূমি, গুরুত্ব ও প্রশ্নোত্তর

বিষয়সূচি

বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রথম মাইলফলক। তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ তথা ৫৬.৪০ শতাংশ অধিবাসীর ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে অতি নগণ্য সংখ্যক অর্থাৎ মাত্র ৩.২৭ শতাংশ অধিবাসীর ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলায় ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত যে আন্দোলন পরিচালিত হয় তার নাম ভাষা আন্দোলন।' এই আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উর্দুর সাথে বাংলা ভাষাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি বুকের রক্ত দিয়েই বাঙালিকে তার দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির অধিকার ও জাতীয় চেতনার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ভাষা আন্দোলনের পটভূমি

১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের অব্যবহিত পর থেকেই পূর্ব বাংলার প্রতি অবহেলা ও প্রবঞ্চনা শুরু হয়। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী প্রথম আঘাত হানে সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসীর ভাষা বাংলার উপর। 

পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী প্রথম থেকেই বাঙালিদের সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। তাদের ধারণা ছিল যে, (১) পূর্ব বাংলার বাঙালিরা পুরোপুরি মুসলমান নয়, হিন্দু ঘেঁষা; (২) বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি আদৌ ইসলামিক নয়; (৩) পূর্ব বাংলায় ভারতের প্রভাব অত্যন্ত বেশী। পূর্ব বাংলার এসব সমস্যার সমাধানের জন্য পাকিস্তানী শাসকরা (ক) বাঙালিদের পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীনে রেখে সাচ্ছা মুসলমান বানাতে (খ) উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করে হিন্দু সংস্কৃতির মূলোচ্ছেদ করতে এবং (গ) বাংলা ভাষাকে ইসলামীকরণ, সংস্কৃত ও আদি বাংলা শব্দমালাকে বাতিল, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চার প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোকে ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছিল। একজন গবেষকের মতে, "the Pakistani policy was directed towards 'assimilating' the Bengali subnation into Pakistani mainstream."

বাংলা ভাষাকে অবহেলা করা এবং উর্দু ভাষাকে পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পর থেকেই পরিলক্ষিত হয়। পাকিস্তানের মুদ্রা, ডাক টিকেট, মানিঅর্ডার ফরম, রেলের টিকেট প্রভৃতিতে কেবল ইংরেজী ও উর্দুর ব্যবহার হতে দেখা যায়। পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনের বিষয় তালিকা থেকে এবং নৌ ও অন্যান্য বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষায় বাংলাকে বাদ দেয়া হয়। এমনকি পাকিস্তান গণপরিষদের সরকারি ভাষা হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে শুধু ইংরেজি ও উর্দুকে নির্বাচন করা হয়। ১৯৪৭ সালের ২৭ নভেম্বর করাচীর শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে এরূপ ষড়যন্ত্রের কারণে পূর্ব বাংলায় যথেষ্ট উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্ব থেকেই রাষ্ট্র ভাষা প্রশ্নে বিতর্ক শুরু হয়। ১৯৪৭ সালের ১৭ মে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা চৌধুরী খালেকুজ্জামান হায়দ্রাবাদের 'উর্দু সম্মেলনে' সভাপতির ভাষণে ঘোষণা করেন 'উর্দুই হবে পাকিস্তনের রাষ্ট্রভাষা'। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দীন আহমদ হিন্দীকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার প্রেক্ষিতে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেন। এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জ্ঞানগর্ভ যুক্তি দিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছাড়াও ১৯৪৭ এর মধ্যেই ড. মুহম্মদ এনামুল হক, আব্দুল হক প্রমুখ লেখকগণ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রতি জোর সমর্থন জানিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন 'তমুদ্দুন মজলিস' পূর্ব বাংলার শিক্ষার বাহন ও অফিস আদালতের ভাষা হিসেবে বাংলা এবং উর্দু উভয় ভাষার সুপারিশ করে। এর ফলে পূর্ব বাংলার শিক্ষিত সমাজ এবং ছাত্রসমাজের মধ্যে বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে একটি প্রবল জনমত সৃষ্টি হয়।

শিক্ষিত বাঙালিরা উপলব্ধি করে যে, যদি উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হয় তাহলে সরকারি চাকরী, ব্যবসা ও অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে উর্দুভাষীরা অগ্রাধিকার পাবে এবং আস্তে আস্তে বাঙালিদেরকে গ্রাস করে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করবে। এর অর্থই হল বাঙালি সত্ত্বার সমাধি। অন্য কথায় পূর্ব বাংলার অধিবাসীদেরকে পুনরায় পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধকরণ। তাই একমাত্র উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাঙালি শিক্ষিত সমাজ আন্দোলনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হন।

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে কংগ্রেস পরিষদীয় দলের নেতা কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির সাথে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষাকেও গণপরিষদের সরকারি ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলে এক সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা গণপরিষদের নেতা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এবং মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যদের বিরোধীতার মুখে বাতিল হয়ে যায়। গণপরিষদের প্রস্তাব ঢাকায় পৌঁছালে ছাত্রসমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এর প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' নামে সর্বদলীয় একটি পরিষদ গঠন করে ১১ মার্চ (১৯৪৮) সমগ্র পূর্ব বাংলায় ধর্মঘট পালনের ডাক দেয়া হয়। ১১ মার্চ ধর্মঘট পালনকালে ছাত্র-জনতার উপর নেমে আসে সরকারি পুলিশ ও গুণ্ডা বাহিনীর অবর্ণনীয় নির্যাতন ও গ্রেফতার। এ আন্দোলন ধীরে ধীরে সারা পূর্ব বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে আপোষ করে ৮ দফা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তিতে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ও উর্দুর সমমর্যাদা দান, পূর্ব বাংলায় ইংরেজির স্থলে বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি, গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত হয়।

৮ দফা চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র চার দিন পর নাজিমুদ্দিনের আমন্ত্রণে পূর্ব বাংলা সফরে এসে পাকিস্তানের গভর্ণর-জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯ মার্চ (১৯৪৮) রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে একমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ".... let me make it very clear to you that the state language of Pakistan is going to be Urdu and no other language" অনুরূপভাবে জিন্নাহ ১৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পূর্বের মতই উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দিলে ছাত্ররা 'No' 'No' বলে তাঁর ঘোষণার প্রতিবাদ করে। এরপর ছাত্ররা বাংলাকে উর্দুর সাথে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে। ছাত্ররা তাদের দাবিতে অনড় থাকে। ১৯৪৮ সালের এপ্রিল মাসে পূর্ব বাংলার আইন পরিষদে বাংলাকে প্রদেশের সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব গৃহীত হয়।

ছাত্রসমাজ বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি অব্যাহত রাখে। তবে জিন্নাহর প্রত্যাবর্তনের পর ভাষা আন্দোলনে সাময়িক ভাটা পড়ে। ১৯৫২ সালের পূর্ব পর্যন্ত প্রতি বছর ১১ মার্চকে প্রতিবাদ দিবস হিসেবে পালন করা হত। অবশ্য এর মধ্যে ১৯৫০ সালে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সংবিধানের মূলনীতি কমিটির রিপোর্টের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলায় প্রচণ্ড বিক্ষোভের প্রেক্ষিতে এ রিপোর্ট স্থগিত করা হয়। ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ প্রতিবাদ দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ছাত্র সভাতে আব্দুল মতিনকে আহ্বায়ক করে 'বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' নামে একটি কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি বহুমুখী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনকে আবার বেগবান করে তোলার চেষ্টা করে।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন

১৯৫১ সালে লিয়াকত আলী খান আততায়ীর হাতে নিহত হলে খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। সমস্যা সমাধান অপেক্ষা সমস্যা সৃষ্টির ব্যাপারে নাজিমুদ্দিনের কৃতিত্ব ছিল। তিনি ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারিতে ঢাকায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীরূপে পল্টন ময়দানের জনসভায় জিন্নাহর অনুকরণে ঘোষণা করেন, "পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোন ভাষা নয়।" তাঁর এই বিবেকহীন উক্তির প্রতিবাদে আবার সংগ্রাম শুরু হল। প্রদেশব্যাপী হরতাল, ধর্মঘট ও ছাত্রবিক্ষোভ ক্রমাগত শক্তিশালি হয়ে উঠার প্রেক্ষিতে ৩১ জানুয়ারিতে (১৯৫২) বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দলের সমন্বয়ে 'সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' গঠন করা হয়। সংগ্রাম পরিষদ বাংলা ও উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা, বন্দীদের মুক্তি প্রভৃতি দাবিসহ কয়েকটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। সংগ্রাম পরিষদ নাজিমুদ্দিনের ঘোষণার প্রতিবাদে ২১ ফেরুয়ারি (১৯৫২) সমগ্র পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘট, বিক্ষোভ মিছিল ও সভা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। উল্লেখ্য ঐদিন পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশনের তারিখ নির্ধারিত ছিল। ২১ ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদও ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে। পূর্ব বাংলায় নূরুল আমীনের মুসলিম লীগ সরকার পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য ২০ ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) সন্ধ্যা ৬টা থেকে একটানা এক মাসের জন্য সমগ্র ঢাকা শহরে হরতাল, সভা, মিছিল ইত্যাদি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ১৪৪ ধারা জারি করে। ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা দলে দলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত হয় এবং ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার জন্য সেখান থেকে দশজন দশজন করে মিছিল নিয়ে পরিষদ ভবনের সামনে (বর্তমান ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায়) সমবেত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। এ সময় পুলিশ তাদের উপর গুলি বর্ষণ করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকতসহ সালাম, রফিক, জব্বার প্রমুখ কতিপয় তরুণ শহীদ হয়। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে কয়েকজন মুসলিম লীগ দলীয় সদস্য অধিবেশন থেকে ওয়াক আউট করে এবং ঢাকা শহরে স্বতঃস্ফূর্ত ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন হরতাল পালিত হয়। উপায়ন্তর না দেখে সরকার সেনাবাহিনী তলব ও কার্টু জারি করে। সারা প্রদেশে মাতৃভাষার দাবিতে গণবিক্ষোভ চলতে থাকে। গণবিক্ষোভের মাঝে বাধ্য হয়ে মুসলিম লীগ সরকার ২২ তারিখে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদে বাংলাকে পাকিস্তানের 'সরকারি' ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সুপারিশ করে এক প্রস্তাব পাস করে। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত দেয়া হয়।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য বা গুরুত্ব

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য অপরিসীম। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল বাংলাদেশে প্রথম গণচেতনার সুসংগঠিত সফল গণঅভ্যুত্থান। এই আন্দোলন থেকে পূর্ব বাংলার রাজনীতি ও সংস্কৃতি নতুন ধারায় প্রবাহিত হয়। পাকিস্তানের প্রতি মোহ এবং রাজনীতিতে ধর্মীয় আচ্ছন্নতা দ্রুতগতিতে কেটে যেতে থাকে। ধীরে ধীরে স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি দানা বাঁধতে শুরু করে। জনৈক লেখক এ আন্দোলনকে "it was the beginning of the end of Pakistan" বলে মন্তব্য করেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই বাঙালি জাতি সর্বপ্রথম অধিকার সচেতন এবং সংগ্রামের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে উঠে। পূর্ব বাংলার স্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবিতে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে।

ভাষা আন্দোলন পূর্ব বাংলায় মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। ইহা পূর্ব বাংলায় ছাত্রসমাজকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে। এই ঘটনার দুই মাসের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন নামে একটি নতুন ছাত্র সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রসমাজই মুখ্য চালকের ভূমিকা পালন করেছে।

ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালিরা তাদের পৃথক জাতিস্বত্বা সম্পর্কে সচেতন হয়। এ আন্দোলন জন্ম দেয় ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের, যা সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। এর মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জাতীয় ধ্যানধারণা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সূত্রপাত ঘটে যা পরবর্তী সকল আন্দোলনের পাথেয় হিসেবে কাজ করে।

উপসংহার: 

আসলে ভাষা আন্দোলন একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও কালক্রমে তা রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে এবং বাঙালিকে অধিকার সচেতন করে তোলে। ১৯৫২ সালের পরবর্তী প্রতিটি আন্দোলনে তথা ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে, ১৯৬২ এর শিক্ষা আন্দোলনে, ১৯৬৬ এর ছয়-দফার স্বাধিকার আন্দোলনে, ১৯৬৯ এর গণআন্দোলনে এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে পাকিস্তানের ধ্বংসের সূত্রপাত হয় এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম হয়।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

০১। পাকিস্তান গণপরিষদে কে সর্বপ্রথম উর্দুর সাথে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেন?

উত্তর: কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

০২। কত সালে পাকিস্তানের গর্ভণর-জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব বাংলা সফরে এসে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন?

উত্তর: ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন।

০৩। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রীকে ছিলেন?

উত্তর: খাজা নাজিমউদ্দীন ছিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং নুরুল আমীন ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।

০৪। কত সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন?

উত্তর: ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি।

০৫। কত সালে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের সংবিধানে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়?

উত্তর: ১৯৫৬ সালে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস, পটভূমি, গুরুত্ব ও প্রশ্নোত্তর"