নিরাপত্তা অধ্যয়ন কাকে বলে? নিরাপত্তা অধ্যয়নের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় 
মাস্টার্স শেষ পর্ব
রাষ্ট্রবিজ্ঞান
বিষয় কোড : ৩১১৯০৯ 

নিরাপত্তা অধ্যয়ন (Security Studies)
রচনামূলক প্রশ্নবলি


প্রশ্ন: নিরাপত্তা অধ্যয়ন কি? নিরাপত্তা অধ্যয়নের গুরুত্ব আলোচনা কর।

ভূমিকাঃ একুশ শতকে বৈশ্বিক, জাতীয়, আঞ্চলিক ও ক্ষুদ্র পর্যায়ে নিরাপত্তার ঝুঁকি ও প্রকৃতি নির্ণয় করা এবং এর সমস্যা সমাধানে নিরাপত্তা অধ্যয়নের কোনো বিকল্প নেই। নিরাপত্তা একটি সর্বজনীন বিষয়, যা সকল জাতি রাষ্ট্রের কাঠামো আদর্শগত উপাদানের সাথে জড়িত। সুতরাং নিরাপত্তা অধ্যয়ন হলো বিজ্ঞানের এমন একটি শাখা, যেখানে প্রচলিত ও অপ্রচলিত নিরাপত্তা, তাদের প্রকৃতি ও পরিধি তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।

নিরাপত্তা অধ্যয়ন কি?

নিরাপত্তা অধ্যয়ন হলো বিজ্ঞানের এমন একটি শাখা, যেখানে প্রচলিত ও অপ্রচলিত নিরাপত্তা, তাদের প্রকৃতি ও পরিধি তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। জাতি ও রাষ্ট্রের নানা রকমের ভয়ভীতি থাকে। এ সকল ভয়ভীতিকে নিরাপত্তা অধ্যয়নের মাধ্যমে দূর করতে হয়।
What is security study? Write about the importance of security study
নিরাপত্তা অধ্যয়ন কাকে বলে? নিরাপত্তা অধ্যয়নের গুরুত্ব সম্পর্কে লিখ

প্রামাপ্য সংজ্ঞাঃ বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে নিরাপত্তা অধ্যয়নের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হলো:

১. সামির আমিন (Samir Amin) বলেন, The connotation of the security studles is to protect the nation and the state from the cleavages অর্থাৎ নিরাপত্তা অধ্যয়ন হলো কোনো জাতি এবং রাষ্ট্রকে দ্বিধাবিভক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করা।

২. Talcott Persons (ট্যালকট পারসম্ভ) বলেন, "The denotation of security studies is to make the nation free from concept of moecuri) "অর্থাৎ নিরাপত্তা অধ্যয়ন হলো জাতিকে অনিরাপত্তার আশংকা থেকে মুক্ত রাখা।

৩. II. J. Laski (এইচ, জে. লাস্কি) বলেন, "The idea of security studies is related to the involvement of the state with the idea of insecurity studies অর্থাৎ নিরাপত্তা অধ্যয়নের ধারণা রাষ্ট্রের অনিরাপত্তাহীনতা অধ্যয়নের ধারণার সাথে সম্পর্কিত।

নিরাপত্তা অধ্যয়নের গুরুত্বঃ

নিম্নে নিরাপত্তা অধ্যয়নের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো:

১. বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তাঃ

বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা একুশ শতকের বিশ্বায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানুষের সাথে মানুষের এতো মিথস্ক্রিয়া বেড়েছে যে, বিশ্বের এক প্রান্তের মানুষ অন্য প্রান্তের মানুষের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এমতাবস্থায় বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে নিরাপত্তা অধ্যয়নের গুরুত্ব অপরিসীম।

২. মানবিক নিরাপত্তাঃ

আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে মানবিক নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থায় নিরাপত্তাকে বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রকে আরো ক্ষমতা চর্চার সুযোগ করে দিয়ে মানবিক নিরাপত্তা নিয়ে যে খেলা চলছে, এমন অবস্থায় মানবিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে নিরাপত্তা অধ্যয়নের বিকল্প নেই।

৩. জ্বালানি নিরাপত্তাঃ

জ্বালানির জন্য পৃথিবীর 'কেন্দ্র' ও 'প্রান্তের' দেশের মধ্যে নির্ভরশীলতা নতুন বিষয় নয়। সুতরাং জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধির বহুমাত্রিক আলোচনা নিরাপত্তা অধ্যয়নের মাধ্যমে জানা যায়। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে নিরাপত্তা অধ্যয়নের গুরুত্ব অপরিসীম।

৪. গৃহযুদ্ধ প্রতিরোধঃ

ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, ঔপনিবেশিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উপাদানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যকার গৃহযুদ্ধ প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা অধ্যয়নের গুরুত্ব অপরিসীম।

৫. লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণঃ

আধুনিক বৈশ্বিক উন্নয়ন সূচকে লিঙ্গীয় সমতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একটি রাষ্ট্র কখনই জাতীয় নিরাপত্তার জায়গায় পৌছাতে পারবে না, যদি কিনা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে লিঙ্গীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে। সুতরাং নিরাপত্তা অধ্যয়নের জ্ঞান দিয়ে লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ করা যায়।

৬. বৈশ্বিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টিঃ

বৈশ্বিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টিতে নিরাপত্তা অধ্যয়নের গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা নিরাপত্তা অধ্যয়নের বহুমাত্রিক জ্ঞান দিয়ে বিশ্বের শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রীয় চিন্তাবিদদের উচিত বৈশ্বিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।

৭. মারণাস্ত্রের প্রসার রোধঃ

বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোতে বাজার দখল, ক্ষমতার চর্চা এবং কল্পিত গণতন্ত্র চর্চার নামে মারণাস্ত্রের প্রসার এতো বৃদ্ধি পাচ্ছে যে, এ অবস্থায় নিরাপত্তা অধ্যয়ন ছাড়া মারণাস্ত্রের কুফল রোধ করা সম্ভব নয়। সুতরাং মারণাস্ত্রের প্রসার রোধ করার জন্য নিরাপত্তা অধ্যয়ন অত্যন্ত জরুরি।

৮. সামরিক আগ্রাসন প্রতিরোধঃ

পুঁজি আর ক্ষমতার জোরে এক রাষ্ট্রের প্রতি আরেক রাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন বিশ্বশান্তির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এমতাবস্থায় নিরাপত্তা অধ্যয়নের জ্ঞান দিয়ে সামরিক আগ্রাসন প্রতিরোধ করা সম্ভব।

৯. যুদ্ধের ভয়াবহতা জানাঃ

নিরাপত্তা অধ্যয়নের মাধ্যমে যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। অর্থাৎ অতীত সময়ের যুদ্ধের কুফলের কারণে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে যেসব কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, সে সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়।

১০. অর্থনৈতিক আগ্রাসন প্রতিরোধঃ

বাজার দখল বা অর্থনৈতিক আগ্রাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নিরাপত্তা অধ্যয়নের গুরুত্ব অপরিসীম। বাজার আগ্রাসনের কুফলের প্রভাবে আর্থিক আগ্রাসন বৃদ্ধি পেয়ে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় নিরাপত্তা অধ্যয়নের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

১১. বৈদেশিক সাহায্যের কুফল জানাঃ

উন্নত রাষ্ট্রগুলো বৈদেশিক সাহায্যের নামে অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশসমূহে ক্ষমতা চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করে। এমতাবস্থায় নিরাপত্তা অধ্যয়নের বৈষয়িক জ্ঞান দিয়ে বৈদেশিক সাহায্যের কুফল প্রতিরোধ করা সম্ভব।

১২. দারিদ্র্য বিমোচনঃ

বৈশ্বিক দারিদ্র্য ও বেকারত্ব রোধে নিরাপত্তা অধ্যয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিরাপত্তা অধ্যয়নের বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দারিদ্রদ্র্য বিমোচন ও বেকারত্ব রোধে সমস্যাসংকুল রাষ্ট্রগুলো কাজ করতে পারে।

উপসংহারঃ পরিশেষে বলা যায় যে, একুশ শতকের বৈশ্বিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রক্ষায় নিরাপত্তা অধ্যয়নের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আধুনিক বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানকল্পে নিরাপত্তা অধ্যয়ন ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। সুতরাং বিশ্বের সার্বিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য নিরাপত্তা অধ্যয়নের কোনো বিকল্প নেই।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url