প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের শশাঙ্কের স্থান নির্ণয় কর

গৌড়রাজ শশাঙ্কের ইতিহাস(৬০৬-৬৩৭ খ্রী.)

ভূমিকাঃ প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে শশাঙ্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন। বাঙালী রাজগণের মধ্যে শশাঙ্ক প্রথম সার্বভৌম নরপতি। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, শশাঙ্ক শুধু গৌড়ের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হননি, বরঞ্চ গৌড়রাজ্যের সীমা মগধ (দ. বিহার) ও উড়িষ্যার উত্তরাঞ্চলে বৃদ্ধি করেছিলেন, এমনকি উত্তর ভারতের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার মত শক্তিও তিনি অর্জন করেন। তাঁর নেতৃত্বেই সর্বভারতীয় বা অন্তত উত্তর ভারতীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশের প্রথম পদক্ষেপ হয়।

প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের শশাঙ্কের স্থান নির্ণয় কর

প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের শশাঙ্কের স্থান নির্ণয় কর 

শশাঙ্ক সম্পর্কে ঐতিহাসিক উপাদান: 

হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্টের 'হর্ষচরিত' এবং চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং এর বিবরণী থেকে শশাঙ্ক সম্পর্কে অধিকাংশ তথ্য পাওয়া যায়। বাণভট্ট ও হিউয়েন সাং উভয়ই ছিলেন শশাঙ্কের বিরোধী পক্ষের লেখক। ড. মজুমদারের মতে, এই সকল লেখকরা ছিলেন পক্ষপাতদুষ্ট। এছাড়া বৌদ্ধগ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প, শশাঙ্কের আমলে কিছু মুদ্রা, শিলা ও তাম্রলিপি থেকেও কিছু তথ্য পাওয়া যায়। 

শশাঙ্কের বংশ পরিচয় ও গৌড়ের ক্ষমতা লাভ: শশাঙ্কের প্রথম জীবন সম্পর্কে সঠিক কিছুই জানা যায় না। তাঁর বংশ পরিচয়ও অজ্ঞাত। এছাড়া তিনি কিভাবে সার্বভৌম ক্ষমতা দখল করেন তারও সঠিক নির্দেশ পাওয়া যায়নি। প্রাচীন রোহিতাশ্বরের পাহাড়ের গায়ে খোদিত একটি সীলের ছাঁচে "শ্রী মহাসামন্ত শশাঙ্ক" নামটি থেকে অনেকে মনে করেন যে, শশাঙ্ক পরবর্তী গুপ্তদের অধীনে সামন্তরাজা ছিলেন। যশোরে প্রাপ্ত শশাঙ্কের কিছু মুদ্রায় তাঁর 'নরেন্দ্রগুপ্ত' উপাধি থেকে অনেকে বলেন যে, তিনি গুপ্তবংশসম্ভূত ছিলেন। তবে এসব মতের সবই আনুমানিক। ড. আর. জি. বসাকের মতে, তিনি গৌড়ের পূর্ববর্তী রাজা জয়নাগের বংশধর ছিলেন। এ মতটিও আনুমানিক। তবে ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়সহ অধিকাংশ পণ্ডিতই তাঁদের বিবরণে শশাঙ্ককে পরবর্তী গুপ্তবংশীয় মহাসেন গুপ্তের সামন্ত বলে মত দিয়েছেন। 

সম্ভবতঃ ৬০৬ খ্রীস্টাব্দ নাগাদ শশাঙ্ক পরবর্তী গুপ্তশাসকদের হাত থেকে গৌড় মুক্ত করে গৌড়ের সিংহাসনে বসেন। তাঁর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ। এই স্থানটিকে বর্তমানে চিহ্নিত করা হয়েছে। হিউয়েন সাং এর সূত্রে জানা যায় কর্ণসুবর্ণ নগরে "রক্ত মৃত্তিকা বিহার" অবস্থিত ছিল। মুর্শিদাবাদ জেলার চিরুটি রেলস্টেশনের কাছে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে একটি শিলালিপি পাওয়া গেছে যাতে লেখা ছিল "শ্রী রক্তমৃত্তিকা বিহার"।

শশাঙ্কের রাজ্য জয়

গৌড়ে সার্বভৌম শক্তি প্রতিষ্ঠা করেই শশাঙ্ক রাজ্য বিস্তারে মনোযোগী হন। বাংলার উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাংশ তাঁর রাজ্যের অধীন ছিল। এ অঞ্চলে তাঁর শিলালিপি পাওয়া গেছে। তাছাড়া এ এলাকায়ই পরবর্তী গুপ্তদের শাসনের পর শশাঙ্কের উদ্ভব। বঙ্গ বা পূর্ব বাংলায় শশাঙ্কের অধিকার বিস্তৃত হয় কিনা তা সঠিক জানা যায় নি। তবে ধারণা করা হয় বাংলার বাইরে সাম্রাজ্য বিস্তারের পূর্বে সমগ্র বাংলাদেশে তাঁর অধিকার বিস্তৃত হয়। সম্ভবতঃ মগধ (দ. বিহার) অঞ্চলও প্রথম থেকে তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল।

শশাঙ্ক তাঁর রাজ্য বিস্তার নীতির প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে বাংলার প্রাকৃতিক সীমান্ত লাভের চেষ্টা করেন। পূর্বে ব্রহ্মপুত্র, উত্তরে হিমালয় ও দক্ষিণে চিল্কা হ্রদ পর্যন্ত বাংলার প্রাকৃতিক সীমান্ত। দুবিলিপি থেকে জানা যায় গৌড় রাজ কামরূপের ভাস্কর বর্মণকে পরাজিত করে বন্দী করেন। সম্ভবতঃ এই গৌড়রাজ ছিলেন শশাঙ্ক। দক্ষিণে শশাঙ্ক দণ্ডভূক্তির রাজা শম্ভুযশকে পরাজিত করেন এবং এরপর উৎকল ও কঙ্গোদ বা গঞ্জাম জয় করেন। উড়িষ্যার শৈলোদ্ভব রাজবংশ ৬১৯ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত শশাঙ্কের বশ্যতা স্বীকার করে। গঞ্জামের মহাসামন্ত মাধবরাজের লিপিতেও শশাঙ্কের প্রতি আনুগত্য জানানো হয়েছে। ড. আর. সি. মহমদারের মতে, "শশাঙ্গের পূর্বে আর কোন বাঙালী রাজা এরূপ বিস্তৃত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল বলে জানা যায়নি।"

এরপর শশাঙ্ক পশ্চিম সীমান্তে রাজ্য বিস্তার নীতি গ্রহণ করেন এবং কনৌজের মৌখরীদের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। সিংহাসনে বসার পর তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে মৌখরীদের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। থানেশ্বরের শক্তিশালী রাজা প্রভাকর বর্ধনের কন্যা রাজ্যশ্রীর সঙ্গে কনৌজের মৌখরী রাজা গ্রহবর্মনের বিবাহ হলে কনৌজ-থানেশ্বর জোট গড়ে উঠে। এই জোটকে শশাঙ্ক তাঁর জন্য হুমকি হিসেবে গণ্য করেন এবং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মালবরাজ দেবগুপ্তের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেন। মালবের সঙ্গে আবার থানেশ্বরের ঘোর বিরোধ ছিল।

কনৌজ জয়ঃ এরপর শশাঙ্ক মগধ থেকে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে গঙ্গার খাত ধরে বারানসী পর্যন্ত গঙ্গার উপকূল অধিকার করেন এবং কনৌজের মৌখরী শক্তিকে বেষ্টিত করে ফেলেন। ইতোমধ্যে থানেশ্বর-কনৌজ জোটের দুর্বলতার সুযোগে শশাঙ্ক ও দেবগুপ্ত কনৌজ আক্রমণ করে গ্রহবর্মণকে হত্যা এবং তাঁর স্ত্রী রাজ্যশ্রীকে কনৌজে বন্দী করেন। এ সময় প্রভাকর বর্ধনের জ্যেষ্ঠপুত্র রাজ্যবর্ধন থানেশ্বরের সিংহাসনে বসে ভগ্নী রাজ্যশ্রীকে উদ্ধারের জন্য দশ সহস্র অশ্বারোহী সৈন্যসহ কনৌজের দিকে অগ্রসর হন। তিনি পথিমধ্যে মালব রাজ দেবগুপ্তকে আক্রমণ করে পরাস্ত ও হত্যা করেন। কিন্তু রাজ্যবর্ধন কনৌজ দখল ও ভগ্নীকে উদ্ধারের পূর্বেই শশাঙ্কের হাতে নিহত হন। বাণভট্ট ও হিউয়েন-সাংসহ শশাঙ্কের বিরুদ্ধবাদী লেখকরা মনে করেন বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে শশাঙ্ক রাজ্যবর্ধনকে নিহত করেছিলেন। এই কারণে বাণভট্ট শশাঙ্ককে গৌড়াধম' ও গৌড়পাষণ্ড' বলেছেন। কিন্তু আধুনিক পণ্ডিতদের বিচারে বিশ্বাসঘাতকতার তত্ত্বটি গৃহীত হয়নি। 

আনি রাজ্যবর্ধনের মৃত্যুর পর হর্ষবর্ধন থানেশ্বরের সিংহাসনে বসেন। তিনি কালবিলম্ব না করে ভগ্নী রাজ্যশ্রীকে উদ্ধার করতে অগ্রসর হন এবং পৃথিবী গৌড়শূন্য' অর্থাৎ শশাঙ্ককে ধ্বংস করার জন্য শপথ গ্রহণ করেন। এসময় হর্ষবর্ধন কামরূপরাজ ভাস্করবর্মনের সঙ্গে মিত্রতায় আবদ্ধ হন। এতে পূর্বে কামরূপ ও পশ্চিমে থানেশ্বর শক্তি দ্বারা শশাঙ্ক আক্রান্ত হন। তবে এ যুদ্ধের ফলাফল সম্পর্কে 'হর্ষচরিত' ও হিউয়েন সাং এর বিবরণীতে কিছু বলা হয়নি। অনেককাল পরে লেখা গ্রন্থ 'আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প' শশাঙ্কের পরাজয়ের কথা বলেছে। তাই এর তথ্য নির্ভরযোগ্য নয়। সম্ভবতঃ শশাঙ্ক হর্ষবর্ধন ও ভাস্কর বর্মন কর্তৃক দুই দিক থেকে আক্রান্ত হয়ে কনৌজ পরিত্যাগ করেন। তবে আরও দীর্ঘদিন তিনি স্বাধীনভাবে গৌড় শাসন করেন। হিউয়েন সাং এর মতে, শশাঙ্কে মৃত্যুকাল (৬৩৭ খ্রী.) পর্যন্ত মগধের উপর তাঁর অধিকার বহাল ছিল।

শশাঙ্কের ৬১৯ খ্রীস্টাব্দের গঞ্জামলিপি প্রমাণ করে যে, এই সময় পর্যন্ত গঞ্জাম তাঁর অধিকারে ছিল। এতে প্রমাণ হয় তাঁর মৃত্যুকাল অবধি অর্থাৎ ৬৩৭খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি গৌড়, মগধ, দণ্ডভুক্তি, উৎকল ও কঙ্গোদের অধিপতি ছিলেন। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মানবদেবকে পরাজিত করে হর্ষবর্ধন ও ভাস্কর বর্মন গৌড়দেশ অধিকার করে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন।

শশাঙ্কের ধর্মঃ বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, শশাঙ্ক শৈব ছিলেন। তাঁর মুদ্রায় শিবের মূর্তি খোদাই করা ছিল। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হিউয়েন সাং এবং বাণভট্ট শশাঙ্ককে বৌদ্ধ বিদ্বেষী বলেছেন। হিউয়েন সাং এর বর্ণনা মতে শশাঙ্ক বুদ্ধগয়ার বোধিবৃক্ষ কেটে ফেলেন এবং পাটলিপুত্রে বুদ্ধের পদচিহ্ন সম্বলিত পাথর উপড়ে দেন। এর জন্য শশাঙ্ক কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হন। বোধি বৃক্ষ কাটার সঙ্গে সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক শশাঙ্ক রোগাক্রান্ত হয়েছিলেন। কারণ 'বৃহদ্ধর্ম পুরাণ' এর বিবরণীতে জানা যায় রোগ নিরাময়ের জন্য শশাঙ্ক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন এবং এই উদ্দেশ্যে শাকদ্বীপী ব্রাহ্মণদের বাংলায় নিয়ে এসেছিলেন।

শশাঙ্ক যে বৌদ্ধদের নির্যাতন করেন, হিউয়েন সাং এর এই একপেশে বক্তব্যকে আধুনিক পণ্ডিতগণ গ্রহণ করেননি। তঁদের মতে এরকম বৌদ্ধ বিদ্বেষী হলে শশাঙ্ক দীর্ঘকাল কিংবদন্তিতে মানুষের মুখে মুখে প্রশংসিত হতেন না। তাঁদের মতে বৌদ্ধ নির্যাতন যদি তিনি করে থাকেন তবে তা রাজনৈতিক কারণেই করেছেন। শশাঙ্কের বৌদ্ধ বিদ্বেষ সম্পর্কে হিউয়েন সাং এর বক্তব্যে কিছুটা স্ববিরোধীতা রয়েছে। কারণ তিনি বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসার যথেষ্ট ছিল বলে মন্তব্য করেছেন। তাছাড়া তিনি তাম্রলিপ্তি, কর্ণসুবর্ণ ইত্যাদি অঞ্চলে অনেক বৌদ্ধ স্তুপ দেখেছিলেন।

শশাঙ্কের কৃতিত্ব:

১. একজন সামন্ত হিসেবে জীবন শুরু করলেও শশাঙ্ক পরবর্তী গুপ্তদের শাসন থেকে গৌড় মুক্তি করে এক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

২. তিনি সর্বপ্রথম বাংলায় এক সার্বভৌম সাম্রাজ্য গড়ে তুলেন যা বাংলা থেকে উড়িষ্যা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। 

৩. তিনি উত্তর ভারতের পরাক্রান্ত সম্রাট হর্ষবর্ধনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছিলেন।

৪. প্রকৃতপক্ষে তিনি বহির্বঙ্গে রাজ্যজয়ের যে পথ তৈরি করেছিলেন পরবর্তীকালে তাকেই অনুসর করেন পাল রাজা ধর্মপাল।

যেটুকু তথ্য পাওয়া যায় তাতে শশাঙ্ককে প্রজাহিতৈষী রাজা বলা চলে। তাঁর যোগ্য শাসনে কর্ণসুবর্ণ একটি সম্পদশালী নগরীতে পরিণত হয়। তাঁর জনহিতকর কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দণ্ডভুক্তি অঞ্চলে এক বিশাল দিঘি খনন। সম্ভবত: সেচ ব্যবস্থার প্রয়োজনেই এই দিঘি খনন করা হয়েছিল।

উপসংহারঃ পরিশেষে বলা যায় যে, ভারতের রাজনীতির ক্ষেত্রে শশাঙ্ক বাংলাকে এক বিশিষ্ট মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি ছিলেন চতুর ও কূটকৌশলী রাজনীতিবিদ। তিনি কুটনীতির সাহায্যে মৌখরী রাজবংশের ধ্বংস সাধন করেছিলেন। বাংলার রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি এবং উত্তর ভারতের রাজনীতিতে বাংলার প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি কারণে তিনি বাংলার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনিই প্রাচীন বাংলার গুরুত্বপূর্ণ নরপতি এতে কোন সন্দেহ নেই।

শশাঙ্কের পর বাংলার রাজনৈতিক অবস্থা

ক. বাংলার রাজনৈতিক অনৈক্য

৬৩৭ খ্রীস্টাব্দে শশাঙ্কের মৃত্যুর পর কেন্দ্রীয় শক্তির অভাবে প্রায় একশত বৎসর ধরে বাংলায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা বিরাজমান থাকে। শশাঙ্ক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাংলার রাজতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যায়। শশাঙ্ক উত্তর ও পশ্চিম বাংলায় যে সার্বভৌম রাজশক্তি স্থাপন করেন তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলার দুই অঞ্চল পুনরায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আনুমানিক ৬৩৮ খ্রীস্টাব্দে হিউয়েন সাং বাংলা পরিভ্রমণকালে পুণ্ড্রবর্ধন, কর্ণসুবর্ণ, সমতট, কজঙ্গল ও তাম্রলিপ্তি এই পাঁচটি স্বাধীন ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের কথা উল্লেখ করেন। আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প' নামক বৌদ্ধ গ্রন্থেও শশাঙ্কের পর গৌড় রাষ্ট্রে অন্তর্বিদ্রোহের ফলে যে অরাজকতার সৃষ্টি হয়েছিল তার বিবরণ আছে। এই সময়ের বাংলার প্রশাসনকে 'গৌড়তন্ত্র' বলে উপহাস করা হত। অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গৌড়ে ও মগধে পরবর্তী গুপ্ত বংশীয় আদিত্য সেন ও তাঁর তিনজন উত্তরাধিকারীর শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল।

সপ্তম শতাব্দীর প্রথম দিকে বঙ্গে খড়গ বংশ রাজত্ব করত। এরূপ রাজনৈতিক অনৈক্যের কারণে বাংলা বৈদেশিক আক্রমণের কবলে পড়ে।

খ. বাংলায় বৈদেশিক আক্রমণ

শশাঙ্কের মৃত্যুর পর তাঁর শত্রু হর্ষবর্ধন আনুমানিক ৬৪১ খ্রীস্টাব্দে মগধ জয় করেন এবং হর্ষের মিত্র কামরূপরাজ ভাস্কর বর্মন কর্ণসুবর্ণ স্বরাজ্যভুক্ত করেন। চৈনিক ও তিব্বতী সূত্র থেকে জানা যায় তিব্বতীয় রাজা ওয়াং হিওয়েন সে (৬৪৭-৪৭ খ্রী.) ও তাঁর উত্তরাধিকারী দ্রণসান গামপো দুইবার বাংলায় তাঁদের বিজয় অভিযান চালান। অষ্টম শতকের শুরুতে উত্তর ভারতীয় শৈল বংশীয় এক রাজা পুণ্ড্রদেশ অধিকার করেছিলেন। বাকপতি রচিত 'গৌড়দহ' গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, কান্যকুঞ্জের রাজা যশোবর্মা (৭২৫-৭৫২ খ্রী.) গৌড় ও মগাধিপতিকে হত্যা করে বঙ্গ জয় করেন। যশোবর্মার গৌড় ও বঙ্গ অধিকার বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কারণ কাশ্মীর রাজ ললিতাদিত্য তাঁকে পরাজিত করে গৌড়ের উপর প্রভাব বিস্তার করেন। কলহনের 'রাজতরঙ্গিনী' গ্রন্থে এর উল্লেখ আছে। এই গ্রন্থে এও উল্লেখ আছে যে, ললিতাদিত্যের পৌত্র জয়াসীড় গৌড়ের পাঁচজন রাজকে পরাজিত করেন এবং তিনি পুণ্ড্রনগরে এসেছিলেন। কলহণের এই বিবরণ সম্পূর্ণ সত্য না হলেও আংশিকভাবে সত্য। এতে গৌড়ের পাঁচজন রাজার অবস্থিতি থেকে খণ্ড-বিখণ্ড স্থানীয় শাসনের কথা অনুমান করা যেতে পারে। নেপালের জয়দেবের শিলালিপি থেকে জানা যায় ভগদত্ত বংশীয় কামরূপরাজ শ্রী হর্ষ গৌড় রাজ্য আক্রমণ করেন।

ক্রমাগত বিদেশী শত্রুর আক্রমণোনবাংলার রাজনৈতিক ভারসাম্য অনেকাংশে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল এবং এক অস্থির অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। মহাস্থানের ধ্বংসাবশেষে এই অস্থিরতার প্রমাণ পাওয়া যায়। বৈরাগী ভিটায় খনন কার্যের ফলে গুপ্ত ও পাল যুগের মধ্যবর্তী স্তরে স্তুপাকার ধ্বংসাবশেষ, এই অস্থির অবস্থারই সাক্ষ্য দেয়।



Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url