প্রাগৈতিহাসিক কাল হতে বাংলার গুপ্ত শাসন আলোচনা

সর্বপ্রথম কোন সময়ে বাংলাদেশে মানুষের বসতি শুরু হয়, তা সঠিকভাবে বলা কঠিন। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ অর্থাৎ গ্রীকদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত বাংলার প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে কোন কিছু জানা যায়নি। তবে প্রত্মতাত্ত্বিক বিভিন্ন নিদর্শন আবিষ্কারের ফলে এ কথা বলা যায় যে, অন্যান্য দেশের ন্যায় এদেশেও আদিম মানব সভ্যতার বিবর্তন ঘটেছে। প্রথমে প্রত্ম-প্রস্ত র যুগ, পরে নব্য প্রস্তর যুগ এবং আরও পরে তাম্রযুগের বিবর্তনের ধারা উন্নততর সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। বাংলার বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে সভ্যতার প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়। অজয় নদের দক্ষিণ দিকে পাণ্ডু রাজার টিবিতে যে সব নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে তা থেকে পণ্ডিতগণ অনুমান করেন যে, খ্রীস্টের জন্মের দেড় হাজার বছর আগে এখানে মানব সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল।

Discussion of the Gupta rule of Bengal from prehistoric times
প্রাগৈতিহাসিক কাল হতে বাংলার গুপ্ত শাসন আলোচনা

বৈদিক আর্যগণ যখন পঞ্চনদ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে তখনকার বাংলাদেশের অবস্থা সঠিকভাবে জানার কোন উপায় নেই। তবে আর্যদের প্রভাব বাংলাদেশে বিস্তার লাভ করেছিল অনেক পরে। ঐতরেয় আরণ্যকে সর্বপ্রথম বাংলার উল্লেখ পাওয়া যায়। বৌধায়নের ধর্মসূত্র, মানব ধর্মশাস্ত্র ইত্যাদি গ্রন্থে পুণ্ড্র, বঙ্গ প্রভৃতি অঞ্চলের নাম রয়েছে এবং এতদঞ্চলের জনগণ সম্পর্কে বিভিন্ন নিন্দাসূচক মন্তব্য (যেমন- অসুর, দস্যু) করা হয়েছে। পুরাণ, মহাভারত ও পরবর্তী ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতির উল্লেখ দেখা যায় এবং আর্য প্রভাব বিস্তারের নানান কাহিনী পাওয়া যায়। এসব উল্লেখ থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন খণ্ড রাজ্যের কথাও অনুমান করা হয়।

খ্রীষ্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে অলেকজাণ্ডার যখন ভারত আক্রমণ করেন তখন বঙ্গদেশ যে একটা পরাক্রান্ত রাজ্য ছিল তা সমসাময়িক গ্রীক লেখকদের বর্ণনা হতে জানা যায়। গ্রীক ঐতিহাসিকগণ তাঁদের বর্ণনায় গঙ্গরিডই নামে যে এক পরাক্রান্ত জাতির উল্লেখ করেছেন তারা বাংলাদেশেরই অধিবাসী। তবে এ রাজ্যের সঠিক অবস্থান সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ একমত নন। টলেমী ও প্লিনির বর্ণনানুযায়ী গঙ্গা নদীর মোহনা ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের অধিবাসী গঙ্গরিডই জাতি বলে পরিচিত। গ্রীক লেখক ডিওদোরসের লেখনীতে এই গঙ্গরিডই জাতির বিপুল সৈন্যবাহিনী ও চার হাজার রণহস্তির উল্লেখ আছে। গ্রীক লেখকদের বিরবণীতে এই বিপুল সামরিক শক্তি ও সেনাবিন্যাসের উল্লেখ বাংলাদেশের গঙ্গাবিধৌত অঞ্চলে এক বিরাট রাজশক্তির পরিচয় বহন করে।

আলেকজাণ্ডারের প্রত্যাবর্তনের পর চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ভারতবর্ষে এক বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। গ্রীক ও বৌদ্ধ লেখনীর উপর ভিত্তি করে অনুমান করা যায় যে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল মৌর্য সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। উক্তরবঙ্গে মৌর্য শাসনের প্রমাণ পাওয়া যায় বগুড়া জেলার মহাস্থান গড়ে একটি শিলালিপি থেকে। ব্রাহ্মী অক্ষরে লেখা এই লিপি হতে প্রতিপন্ন হয় যে, উত্তরবঙ্গের ঐ অঞ্চলের মৌর্য শাসনের কেন্দ্রস্থল ছিল পুণ্ড্রনগর। প্রাচীন পুণ্ড্রনগর যে বর্তমানের মহাস্থান সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এই লিপিতে কেন্দ্র কর্তৃক পুণ্ড্রনগরের মহামাত্রের প্রতি দুর্ভিক্ষ কবলিত প্রজাদের মধ্যে রাজশস্যাগার হতে ধান্য ও রাজভান্ডার হতে অর্থ সাহায্যের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মহাস্থান লিপির বিষয়বস্তু নিঃসন্দেহে একটি সুনিয়ন্ত্রিত ও সুসংঘবদ্ধ শাসন ব্যবস্থার কথা ঘোষণা করে। যদি এই শিলালিপি মৌর্য যুগেরই হয়ে থাকে তাহলে মৌর্য শাসনের সুব্যবস্থা উত্তরবঙ্গও ভোগ করেছিল একথা নিঃসন্দেহে বলা চলে। যুয়ান চুয়াঙের বর্ণনা সত্য হিসেবে গ্রহণ করলে উত্তর বঙ্গ ছাড়াও বাংলাদেশের অন্যান্য জনপদে মৌর্য শাসন ছিল বলে মনে করতে হয়। (দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা) অঞ্চলে মৌর্য সম্রাট অশোক নির্মিত বৌদ্ধ স্তুপ ও বিহার দেখেছেন বলে তাঁর বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন।

মৌর্য শাসনের পর শুঙ্গ শাসনের সূচনা হয়। এ সময়ের ইতিহাসও অন্ধকারাচ্ছন্ন। মহাস্থান গড়ে শুঙ্গ যুগের কয়েকটি পোড়ামাটির মুর্তি এবং নোয়াখালিতে প্রাপ্ত কয়েকটি মূর্তি ও শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, শুঙ্গ যুগে বাংলার শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরাজমান ছিল। বাংলাদেশের কোন অংশ কুষাণ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল কিনা সে কথাও সঠিক করে বলা যায় না। তবে কুষাণ সাম্রাজ্যের সংগে বাংলার ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। বাংলার মহাস্থানগড়ে ও তাম্রলিপ্তে কুষাণ স্বর্ণমুদ্রার প্রাপ্তি এ কথা প্রমাণ করে।

পেরিপ্লাস গ্রন্থ ও টলেমীর বিবরণ হতে খ্রীষ্টীয় প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীর বঙ্গদেশ সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। ল্যাটিন ও গ্রীক গ্রন্থের বর্ণনানুযায়ী এ সময়ে গঙ্গরিডই নামে বাংলার একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী রাজ্য ছিল। গঙ্গে ছিল এই রাজ্যের রাজধানী। বাংলার সুক্ষ্ণ মুসলিন কাপড় এই বন্দর হতে বিদেশে রপ্তানী হত। প্রকৃতপক্ষে আলেকজান্ডারের আক্রমণকাল হতে গুপ্তযুগের সূচনা পর্যন্ত বাংলার ইতিহাস এখনও অন্ধকার আচ্ছন্ন। তবে প্রাপ্ত উপাদানসমূহ সমসাময়িক বাংলার সমৃদ্ধির পরিচয় বহন করে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url