ঐতিহাসিক ৬-দফা আন্দোলন। ৬- দফার পটভূমি। ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি। ৬-দফার তাৎপর্য

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ৬-দফা আন্দোলনের তাৎপর্য অপরিসীম। পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ থেকে মুক্তির জন্য আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ৬-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে পূর্ব বাংলার মানুষের পূর্ববর্তী ১৮ বৎসরের সংগ্রামের পটভূমিতে শেখ মুজিবের ঐ ঘোষণা ছিল পাকিস্তানী রাষ্ট্র কাঠামোর অধীনে বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ কর্মসূচি। বস্তুত ৬-দফা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ যার মাধ্যমে বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম নতুন গতি লাভ করে।

ঐতিহাসিক ৬-দফা আন্দোলন। ৬- দফার পটভূমি
ঐতিহাসিক ৬-দফা আন্দোলন। ৬- দফার পটভূমি। ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি। ৬-দফার তাৎপর্য 

৬-দফা কর্মসূচির পটভূমিঃ

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ব বাংলা সামরিক দিক থেকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় থাকে। এই যুদ্ধের সময় কেন্দ্র থেকে এমনকি সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঙালিদেরকে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন যাপন করতে হয়। এ যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় পূর্ব বাংলার প্রতি চরম অবহেলা বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে আরো জোরদার করে তোলে। বিগত ১৮ বছর ধরে নির্মম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শোষণ-বঞ্চনার ফলে বাঙালিরা যখন দারুনভাবে ক্ষুব্ধ তখন পাক-ভারত যুদ্ধকালে এতদঞ্চলের নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্নে তারা আরো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তারা স্পষ্ট উপলব্ধি করে যে, পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর অধীন থেকে কোন দিনই তাদের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে না। শেখ মুজিবর রহমান এই যুক্তিতে পূর্ব বাংলার সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে ৬-দফা দাবী উত্থাপন করলেন। পাক-ভারত যুদ্ধত্তোর পর্যায়ে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন তথা তাসখন্দ চুক্তির বিরোধীতা এবং দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আইউব বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষতঃ পশ্চিম পাকিস্তানের ডানপন্থী রাজনৈতিক নেতারা ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে 'নিখিল পাকিস্তান জাতীয় কনফারেন্স' আহ্বান করে। নেজামে ইসলাম, জায়াতে ইসলামী, কাউন্সিল মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ এই সম্মেলনে যোগদান করে। ইত্তেফাক সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার অনুপ্রেরণায় পূর্ব বাংলার ন্যায়সঙ্গত দাবিগুলো তুলে ধরার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে লাহোর সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, এ সময় তিনি তাঁর বিশিষ্ট সহকর্মীদের সহায়তায় পূর্ব বাংলার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ৬-দফা কর্মসূচি আকারে লিপিবদ্ধ করে সঙ্গে নিয়ে যান। তবে এই ৬-দফার রচয়িতা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য আছে। যাহোক, লাহোর কনফারেন্সের বিষয় নির্ধারণী কমিটির বৈঠকে (৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬) শেখ মুজিবুর রহমান ৬-দফা প্রস্তাব বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করলে তা উক্ত কমিটি কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। ৬ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানী কয়েকটি পত্রিকায় ৬-দফার বিকৃত বিবরণ ছেপে শেখ মুজিবকে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে চিত্রিত করা হয়। ফলে মুজিব ৬ ফেব্রুয়ারির মূল কনফারেন্সে যোগ না দিয়ে কয়েকদিন পর ঢাকায় ফিরে আসেন (১১ ফেব্রুয়ারি) এবং লাহোর কনফারেন্সের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। সম্মেলন থেকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রত্যাহার এবং এর ৬-দফা কর্মসূচি ঘোষণা বাংলার জনগণ কর্তৃক বিপুলভাবে অভিনন্দিত হয়।

১১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি কর্তৃক ৬-দফা কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এই বছরের মার্চ মাসের ১৮, ১৯ এবং ২০ তারিখে ঢাকার ইডেন হোটেলে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন চলাকালে ৬-দফার বিস্তারিত ব্যাখ্যাসহ 'আমাদের বাঁচার দাবি ৬-দফা কর্মসূচি' শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রচার করা হয়। সংক্ষেপে ৬-দফা প্রস্তাবগুলো নিম্নরূপ:

ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি সমূহঃ

১. শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় প্রকৃতি সম্পর্কীত বিষয়ঃ

৬-দফা কর্মসূচির প্রথম দফায় শেখ মুজিবুর রহামান ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের এবং সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত সংসদীয় (Parliamentary) পদ্ধতির মাধ্যমে পাকিস্তানকে একটি সত্যিকারের ফেডারেশন গঠনের প্রস্তাব করেন। চউডার লিক চাউজীর ছাতা

২. কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ারাধীন বিষয়ঃ

দ্বিতীয় দফায় ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ারে দেশরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয় দু'টি রেখে অবশিষ্ট সমস্ত বিষয় প্রদেশসমূহের (স্টেটসমূহের) হাতে ন্যস্ত করার কথা বলা হয়। 

৩. মুদ্রা সম্পর্কীত বিষয়ঃ

তৃতীয় দফায় কার্যকরীভাবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থ পাচার রোধকল্পে শেখ মুজিবুর রহমান দু'টি বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থার প্রস্তাব করেন। এই প্রস্তাব দু'টি হলঃ

ক. পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দু'টি সম্পূর্ণ পৃথক অথচ সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা থাকবে। মুদ্রা ব্যবস্থা আঞ্চলিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং দুই অঞ্চলের জন্য দু'টি পৃথক স্টেট ব্যাংক থাকবে। অথবা দুই অঞ্চলের জন্য একই মুদ্রা থাকবে। এ ব্যবস্থায় মুদ্রা হবে কেন্দ্রের এক্তিয়ারাধীন বিষয়। কিন্তু এ ব্যবস্থায় শাসনতন্ত্রে এমন সুনির্দিষ্ট বিধান থাকতে হবে যাতে পূর্ব পাকিস্তানের মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতে না পারে। এই বিধানে পাকিস্তানে একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে এবং দুই অঞ্চলে দু'টি পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে।

৪. খাজনা-ট্যাক্স-কর ধার্য ও আদায় সম্পর্কিত বিষয়ঃ 

চতুর্থ দফায় দাবি করা হয় যে, সকল প্রকার খাজনা-ট্যাক্স-কর ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। আঞ্চলিক সরকারের আদায়কৃত রাজস্বের একটি অংশ আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ফেডারেল তহবিলে আপনা হতেই জমা হয়ে যাবে। এই মর্মে রিজার্ভ ব্যাংকসমূহের উপর বাধ্যতামূলকভাবে বিধান শাসনতন্ত্রেই থাকবে। এভাবে জমাকৃত অর্থ দ্বারা ফেডারেল সরকার প্রয়োজনীয় খরচ নির্বাহ করবে।

৫. বৈদেশিক মুদ্রা, আন্তঃ প্রাদেশিক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ঃ

পঞ্চম দফায় শেখ মুজিবুর রহমান পাঁচটি প্রস্তাব করেন, যথা (১) দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পৃথক পৃথক হিসাব রক্ষণ'; (২) পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পূর্ব পাকিস্তানের এখতিয়ারে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তনের এখতিয়ারে রাখা; (৩) কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল সরকারের প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা দুই অঞ্চল থেকে সমানভাবে অথবা শাসনতন্ত্রের নির্ধারিত হারে আদায়; (8) দেশজ দ্রব্যাদির বিনা শুল্কে উভয় অঞ্চলের মধ্যে আমদানী-রপ্তানির সুবিধা এবং (৫) বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের, বিদেশে ট্রেড মিশন স্থাপনের এবং আমদানি-রপ্তানির অধিকার আঞ্চলিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করে শাসনতান্ত্রিক বিধান করতে হবে।

৬. প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ঃ 

ষষ্ঠ দফায় শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের জন্য একটি মিলিশিয়া বা প্যারামিলিশিয়া রক্ষীবাহিনী গঠনের দাবি করেন যাতে এই প্রদেশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের একটি অস্ত্র নির্মাণ কারখানা, সামরিক একাডেমী ও এখানে নৌবাহিনীর সদর দপ্তর স্থাপনের প্রস্তাব দেন।

ঐতিহাসিক ৬-দফার পক্ষে প্রতিক্রিয়াঃ

৬-দফা কর্মসূচি প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের বিরাট আলোড়নের সৃষ্টি হয়। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ সাদরে ৬-দফা কর্মসূচিকে গ্রহণ করে। তারা ৬-দফার মধ্যে নিজেদের মনোভাবের প্রতিধ্বনি শুনতে পায়। শেখ মুজিবের ৬-দফা শোষিত ও নির্যাতিত বাঙালীর নিকট তাদের 'ম্যাগনাকার্টা' বা মুক্তিসনদ' রূপে গৃহীত হয়। একটি জনপ্রিয় আন্দোলন হিসেবে দ্রুতই ৬-দফা নিম্ন মধ্যবিত্ত, ছাত্র, শ্রমিক এবং সাধারণ বুদ্ধিজীবী মহলের সমর্থন অর্জন করে। ৬-দফার পক্ষে যে অভাবনীয় জনমত সৃষ্টি হয় তা সত্যিই এক অকল্পনীয় ব্যাপার। শেখ মুজিবুর রহমানের 'কারিশমা' (Charisma) এবং বাংলার সংগ্রামী ছাত্র-সমাজের গতিশীলতা (Dynamism) অল্পকালের মধ্যেই এই কর্মসূচিকে সকল স্তরের বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বলিষ্ঠ ঘোষণায় পরিণত করে। ৬-দফার প্রভাবে জনগণের যে সংগ্রামী ঐক্য গড়ে উঠে তা পাকিস্তানের এলিট শাসকদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলে।

ঐতিহাসিক ৬-দফার বিপক্ষে প্রতিক্রিয়াঃ

৬-দফা প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকার, দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সরকার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা দমনমূলক নীতি গ্রহণ করে। মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি ধর্মভিত্তি দলগুলো আওয়ামী লীগকে 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' হিসেবে চিহ্নিত এবং তারা আওয়ামী লীগের ৬-দফা কর্মসূচিকে জাতীয় সংহতির পরিপন্থীরূপে প্রচার করে। এমনকি ন্যাপ প্রধান মাওলানা ভাসানী ৬-দফাকে পাকিস্তানের সংহতিনাশক কর্মসূচি বলে প্রত্যাখ্যান করেন। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট আইউব খান ৬-দফা আন্দোলনকে 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করে এর বিরুদ্ধে অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগের হুমকি দেন। আইউবের নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর মোনেম খান শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দমনমূলক তৎপরতা বৃদ্ধি করেন। ১৯৬৬ সালের ৮ মে রাত্রে শেখ মুজিব ও তাঁর কযেকজন বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ৬-দফা আন্দোলন সহকর্মীকে পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনে গ্রেফতার করা হয়। পরে শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী করা হয়।

ঐতিহাসিক ৬-দফার তাৎপর্যঃ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ৬-দফা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবকে সামনে রেখে পাকিস্তানের জন্মরগ্ন থেকে আওযামী লীগ যেভাবে চিন্তাভাবনা করে আসছিল, শেখ মুজিবুর রহমান ৬-দফা দাবিতে সেই মনোভাবকেই একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রকাশ করেন, এখানেই তাঁর নতুনত্ব। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে আওয়ামী লীগের ৬-দফা কর্মসূচির পার্থক্য বা নতুনত্ব এখানেই যে, এতে নির্দিষ্টভাবে কেন্দ্রের খাজনা-ট্যাক্স-কর ধার্য ও আদায়ের অধিকার অস্বীকৃত হয় এবং প্রদেশগুলোকে বিদেশের সাথে পৃথক বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং বৈদেশিক মুদ্রার আলাদা হিসাব রাখার অনুমতি দেয়া হয়। এছাড়া এতে আলাদা মুদ্রা ব্যবস্থার বিধানও রাখা হয়। এভাবে ৬-দফা কর্মসূচি বস্তুতঃ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাদেশিক স্বাধিকারের দাবিতে পরিগণিত হয়।

৬-দফা কর্মসূচি থেকে একটা বিষয় পরিস্কার যে, শেখ মুজিব পাকিস্তানকে ফেডারেশন হিসেবে গড়ার প্রস্তাব করলেও আসলে এটা ছিল কনফেডারেশনের দাবি। ৬-দফার মাধ্যমে সার্বিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে আত্মনির্ভরশীল করতে চাওয়া হয়েছে। এদিক থেকে এ প্রস্তাব সম্পূর্ণরূপে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের দাবি যা অচিরেই স্বাধীনতার দাবিতে পরিণত হয়।

৬-দফার আন্দোলনই প্রথমবারের মত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আন্দোলনের গণ্ডি পেরিয়ে সকল পেশা-শ্রেণীর মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। ১৯৬৬ সালের ৭ জুনের আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণীর ব্যাপক অংশগ্রহণ এর প্রমাণ। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গুণগত উত্তরণ ঘটে এবং স্বায়ত্তশাসনের শেষ ও সুস্পষ্ট লক্ষ্যাভিষারী স্বাধিকার আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।

৬-দফা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের রাজনীতিতে একক প্রাধান্য বিস্তার করে এবং এই কর্মসূচির ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এই কর্মসূচির ভিত্তিতেই আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের ব্যাপারে অনড় থাকে। এর ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় শুরু হয় বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে স্বাধিকারের ৬-দফা দাবিই পরিণত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার এক দফা দাবিতে।

সবশেষেঃ

পরিশেষে বলা যায় যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে বাঙালি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শোষণ বঞ্চনার অবসানের সাংবিধানিক রূপরেখা ৬-দফা শেষ পর্যন্ত বাঙালির স্বাধিকারের সর্বোচ্চ দাবিতে পরিণত হয় এবং ৬-দফার আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

ঐতিহাসিক ৬-দফা আন্দোলন সম্পর্কে কুইজ প্রশ্ন ও উত্তরঃ

১। কত সালে এবং কে ঐতিহাসিক ৬-দফা কর্মসূচি পেশ করেন?

উত্তরঃ ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবর রহমান ৬-দফা কর্মসূচি পেশ করেন।

২। ৬-দফা কর্মসূচি কোথায় পেশ করা হয়?

উত্তরঃ লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলির সম্মেলনে।

৩। পাকিস্তানের কোন দলগুলো আওয়ামী লীগকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে?

উত্তরঃ মুসলিম লীগ, জামায়েতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি ধর্মভিত্তিক দলগুলো।

৪। কত সালে শেখ মুজিবর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়?

উত্তর: ১৯৬৬ সালের ৮ মে।

৫। কত সালে এবং কাদের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সাজানো হয়?

উত্তরঃ ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবসহ মোট ৩৫ জনকে এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url