Widget HTML #1

পথশিশুর ইফতার | হৃদয়ছোঁয়া মানবিক গল্প | আল আব্বাস রবিন

পথশিশুর ইফতার

গল্পের নাম: পথশিশুর ইফতার
লেখক: আল আব্বাস রবিন


বিশেষ একটি কারণে পাঁচ দিনের জন্য ঢাকায় আসতে হলো। রাঙামাটি শহর থেকে সরাসরি ঢাকা—সায়েদাবাদ। সেখান থেকে কাকরাইল। পাশেই রমনা পার্ক। আসরের নামাজ পড়ে ভাবলাম, পার্কে একটু ঘুরে আসি।

রমনা পার্কে ঢুকে চারপাশের কর্মকাণ্ড অবাক দৃষ্টিতে দেখছিলাম। রোজার দিনেও এমন কিছু দৃশ্য দেখতে মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। খানিকটা বিরক্ত হয়ে পার্ক থেকে চলে আসব, ঠিক এমন সময় ছোট্ট একটি মেয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল।

বয়স নয় কিংবা দশ হবে। এলোমেলো চুল কপালের ওপর ছড়িয়ে আছে। গায়ের রং শ্যামলা, কিন্তু মুখে অদ্ভুত এক মায়া। চোখ দুটি যেন গভীর গর্তে ঢুকে গেছে। গালগুলো রুক্ষ। দেখলেই বোঝা যায়, দীর্ঘদিনের অনাহার আর কষ্ট তার ছোট্ট মুখটাকে কতটা ক্লান্ত করে দিয়েছে।

পথশিশুর ইফতার গল্পে রেশমীর সঙ্গে ইফতার করছেন একজন মানুষ
রমনা পার্কে পথশিশু রেশমীর সঙ্গে ইফতারের এক হৃদয়ছোঁয়া মুহূর্ত।

আমাকে দেখে মেয়েটি মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,

একা এসেছেন, ভাইয়া?

আমি স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিলাম,

হ্যাঁ।

মেয়েটি আবার জিজ্ঞেস করল,

আপনার কি মন খারাপ?

আমি বললাম,

তুমি জেনে কী করবে?

মেয়েটি খুব মায়াময় কণ্ঠে বলল,

জানেন ভাইয়া, সারাদিন রোজা রেখে খুব কষ্ট হচ্ছে। আর থাকতে পারছি না। ভাবলাম, কারও সঙ্গে একটু কথা বললে হয়তো কষ্টটা কমবে। কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে কথা বলতে চায় না। সবাই শুধু দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়।

মেয়েটির কথা শুনে আমার খুব মায়া হলো। তার সম্পর্কে আরও জানতে ইচ্ছে করল। আমি তাকে নিয়ে পাশের একটি বেঞ্চিতে বসলাম।

মেয়েটি কিছু বলার আগেই আমি প্রশ্ন করলাম,

তুমি এত ছোট মানুষ, রোজা রেখেছ?

মেয়েটি আবার বাঁকা ঠোঁটে মুচকি হেসে বলল,

এমনিতেই তো সারাদিন না খেয়ে থাকতে হয়। তো রোজা রাখলে কি আর আসে যায়? রোজা রাখলে আল্লাহ খুশি হন।

আমি অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

এতটুকু একটি শিশুর মুখে এমন কথা শুনে আমার সুখে-আনন্দে কাটানো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। আমার চোখের কোণ বেয়ে তপ্ত অশ্রুধারা নেমে এলো।

হৃদয়ের কোণে যেন একটা প্রশ্ন নাড়া দিল—কত ধনী পরিবারের আদরের দুলালীরা এত আরাম-আয়েশের মধ্যেও রোজা রাখে না, অথচ এই ছোট্ট পথশিশুটি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য রোজা রেখেছে!

আমি জানতে চাইলাম,

সবগুলো রোজা রেখেছ?

মেয়েটি বলল,

না। দুইটা রাখতে পারিনি। সেহরি খাওয়ার সময় চেতন পাইনি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

কোথায় থাকো?

খুব তৃপ্তির সঙ্গে সে উত্তর দিল,

ওইখানে একটা ভিখারিনীর আখড়া আছে, ওখানে।

আমি আবার জানতে চাইলাম,

তোমার মা-বাবা নেই?

মেয়েটি এক বুক হতাশা নিয়ে উত্তর দিল,

নাহ্। ছোটকাল থিকা ওই ভিখারিনী পাড়ায় থাকি। কে যেন একজন আমারে লালন-পালন করত। হেয় কেমনে মইরা গেছে। তারপর আশপাশের মানুষ আগে খাইতে দিত। কিন্তু এহন আর দেয় না। আমারে ভিক্ষা করতে কয়।

একটু থেমে সে আবার বলল,

জানেন ভাইয়া, আমার একটুও ভিক্ষা করতে মন চায় না। মানুষ কত ছোট করে দেখে। তাই কারও কাছে কিছু চাই না। কেউ কিছু দিলে খাই, না দিলে না খাইয়া থাকি।

আমি মেয়েটির নাম জানতে চাইলাম।

খুশি মনে উত্তর দিল,

রেশমী।

নামটা আমার বেশ ভালো লাগল।

আমি আরও কিছু জানতে চাইছিলাম। এর মধ্যেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। আকাশটাও মেঘাচ্ছন্ন হয়ে উঠল। পশ্চিম আকাশে লাল রঙের সঙ্গে সাদা মেঘগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে।

আমি বললাম,

আমার চলে যেতে হবে। ইফতারের প্রস্তুতি নিতে হবে তো।

মেয়েটি একটু হতাশ চোখে বলল,

আচ্ছা ঠিক আছে, ভাইয়া। যান।

আমি হঠাৎ তাকে জিজ্ঞেস করলাম,

তুমি ইফতার করবে কীভাবে?

মেয়েটি বলল,

এই যে, পুটলির ভিতর কিছু ইফতার আছে। একটু আগে একজন সাহেব ওইখানে আমাদের দিয়ে গেছে।

কী ইফতার আছে, তা দেখার খুব ইচ্ছে হলো।

মেয়েটি বলল,

দেখে আর কী করবেন? দুই-চারটা খেজুর, বেগুনভাজা আর ছোলা-মুড়ি থাকব আরকি।

আমি কিছুটা ব্যথিত মনে বললাম,

আজ আমাকে তোমার সঙ্গে ইফতার করাবে?

মেয়েটি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে হাসতে হাসতে বলল,

করবেন আমার লগে? আমি অনেক খুশি অমু!

আমি আবার বেঞ্চিতে বসলাম। রেশমী তার পুটলি থেকে ইফতার বের করল।

আমি তাকিয়ে দেখলাম, মেয়েটি যা বলেছিল, ঠিক তাই আছে। কয়েকটি খেজুর, বেগুনভাজা আর ছোলা-মুড়ি।

আমার দু'চোখ টলমল করছে। হয়তো আরাম-আয়েশ আর ভোগবিলাসে অভ্যস্ত একজন মানুষ হিসেবে এই ছোট্ট মেয়েটির সামনে দু'ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দিতেও লজ্জা লাগছিল।

আমি বললাম,

তুমি প্রতিদিন এখানে এমন ইফতার করো?

মেয়েটি বাঁকা হাসি মেশানো ঠোঁটে উত্তর দিল,

নাহ্। কোনদিন কোন জায়গায় করি, ঠিক নাই। কোনদিন কম, কোনদিন বেশি থাকে। আবার কোনোদিন সাহেবরা ইফতারি না দিলে শুধু লেইনের পানি খেয়ে ইফতার করি।

আমার ভাবনা ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে আসছিল।

কীভাবে এমন অল্পতেই তুষ্ট হয়ে, সন্তুষ্ট চিত্তে বেঁচে আছে এই মানুষগুলো?

হঠাৎ মসজিদের মিনার থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এলো।

ঢাকা শহর যেন মসজিদের নগরী। চারদিক থেকে ভেসে আসছে আজানের সুমধুর ধ্বনি। সারাদিনের অপেক্ষার পর রোজাদারদের মন এখন ঠান্ডা পানিতে তৃপ্তির ঢেকুর তুলবে।

বড় বড় আলিশান বাড়িতে কে কার চেয়ে বেশি খেতে পারে, হয়তো তারই প্রতিযোগিতা হবে।

আর আমি রমনা পার্কের একটি বেঞ্চিতে বসে জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় একটি ইফতার করছি—একজন পথশিশুর সঙ্গে।

আমি একটি খেজুর মুখে দিলাম। রেশমী দেখলাম মুনাজাত ধরেছে।

প্রায় এক মিনিট মুনাজাত করার পর সে খাওয়া শুরু করল।

আমার খুব ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও দুইটির বেশি খেজুর খেতে পারলাম না।

আমি রেশমীকে বললাম,

কালকে ঠিক এই জায়গায় ইফতার করতে আসবে।

তারপর নামাজ পড়তে চলে গেলাম।

নামাজে দাঁড়িয়ে বুক ফেটে কান্না চলে এলো। ছোট্ট মেয়েটার প্রভুভক্তি আর তার কষ্টের মুহূর্তগুলো খুব গভীরভাবে অনুভব করতে লাগলাম।

অনেক যন্ত্রণা নিয়ে রাতটা কাটালাম।

বারবার রেশমীর কথা মনে পড়ছিল।

পরের দিন জোহরের নামাজ পড়ে মানিকনগর বাজারে গেলাম। অনেকগুলো ইফতার কিনলাম। রেশমীর জন্য কিছু কাপড় কিনলাম। সঙ্গে আরও কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিলাম।

তারপর কাকরাইলে এসে আসরের নামাজ পড়ে রমনা পার্কের সেই বেঞ্চিতে গিয়ে বসলাম।

রেশমীকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল।

আশপাশে এত মানুষের ভিড়ের মধ্যেও আমার মন বারবার খুঁজে ফিরছিল সেই ছোট্ট মেয়ে রেশমীকে।

অনেকক্ষণ ধরে বসে আছি। কিন্তু কোথাও তাকে দেখতে পেলাম না।

আকাশটা প্রতিদিনের মতো আজও পশ্চিম দিকে রক্তবর্ণ ধারণ করে রাতকে কাছে ডাকছে।

মসজিদে মসজিদে আল্লাহর প্রিয় রোজাদার বান্দারা ইফতারের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।

মুয়াজ্জিনরাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন—মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার দুয়ার খুলে দিতে আজানের মাধ্যমে ইফতারের সময় ঘোষণা করবেন।

আর আমি পথ চেয়ে বসে আছি সেই ছোট্ট রোজাদার নিষ্পাপ মেয়েটির জন্য।

খানিক পরেই মুয়াজ্জিন আজানের সুরে পৃথিবীকে জানিয়ে দিলেন—আজকের রোজার দিন শেষ।

তখন আমার ধ্যান ফিরে এলো।

রেশমী আজ আর আসবে না।

আমি সেখানেই বসে একটি খেজুর খেতে খেতে রেশমীর কথা ভাবতে লাগলাম।

সেই ছোট্ট মেয়েটি আজ হয়তো অন্য কোনোভাবে ইফতার নামের কিছু খাবার খেয়ে তৃপ্তির স্বাদ নিচ্ছে।

হয়তো কারও সঙ্গে আবার বন্ধুসুলভ কিছুটা সময় কাটাচ্ছে।

অথবা কোনো সাহেবের গাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলা পলিথিনে মোড়ানো ইফতার না পেয়ে শুধু লেইনের পানি খেয়ে ক্ষুধার জ্বালা মিটিয়ে ইফতার করছে।

আর ইফতারের আগে হয়তো মুনাজাত ধরে প্রভুর কাছে তার বুকের মধ্যে জমে থাকা সব ব্যথার কথা জানাচ্ছে।

আমি সেদিনের মতো সেখান থেকে চলে এলাম। নামাজ পড়লাম।

তারপর ঢাকায় যতদিন ছিলাম, প্রত্যেকদিনই রেশমীকে খুঁজেছি।

কিন্তু তাকে আর কোনোদিন আমার চোখে পড়েনি।

ঢাকা শহরে রেশমীর মতো হাজারো রেশমী হয়তো প্রতিদিন লেইনের পানি খেয়ে ইফতার করে।

হাজারো ছোট্ট শিশু হয়তো ক্ষুধা, অবহেলা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখে রোজা রাখে।

তাদের কারও নাম হয়তো রেশমী, কারও নাম আমরা কোনোদিন জানবই না।

তবুও তারা মানুষ।

তাদেরও ক্ষুধা লাগে, কষ্ট হয়, ভালোবাসা পেতে ইচ্ছে করে।

নোটঃ আরও একটি হৃদয়স্পর্শী ছোট গল্প পড়ুন: ছোট গল্প: সেকেন্ডহ্যান্ড

আর হয়তো আমাদের সামান্য সহানুভূতি, একটি ভালো কথা কিংবা একবেলার খাবারই তাদের কাছে হয়ে উঠতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপহার।

রেশমী আর আমার চোখে পড়েনি।

কিন্তু তার সেই মায়াবী মুখ, ছোট্ট কণ্ঠের সেই কথা—

“রোজা রাখলে আল্লাহ খুশি হন।”

আজও আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে।

(সমাপ্ত)


লেখক পরিচিতি
লেখক: আল আব্বাস রবিন

“পথশিশুর ইফতার” একটি মানবিক ও আবেগঘন গল্প। গল্পটির মাধ্যমে পথশিশুদের জীবনসংগ্রাম, ক্ষুধা, অবহেলা, ধর্মীয় অনুভূতি এবং মানবিকতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "পথশিশুর ইফতার | হৃদয়ছোঁয়া মানবিক গল্প | আল আব্বাস রবিন"