উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের লেখা রম্য নাটক দ্যা টেমিং অফ দ্যা শ্রু

নাটকের নামঃ দি টেমিং অফ দি শ্রু
লেখকঃ উইলিয়াম শেক্সপিয়ার 
(বাংলা ভার্ষণ)

পর্ব- ০৩ (অথ পাত্র-পাত্রী সংবাদ)


একা একা বসে পেক্রশিও ভাবতে লাগল কি ভাবে সে ক্যাথারিনের সঙ্গে আলাপ জমাবে? ভেবে-চিন্তে সে পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলল। পেক্রশিও আপন মনেই বলল, ক্যাথারিন যদি রেগে গিয়ে কথা বলে, তবে আমি বলব যে ওর গলার স্বর নাইটিঙ্গেলের মতই মিষ্টি। মনে হচ্ছে, ও তো কথা বলছে না, মধুর সুরে গান গাইছে। ও যদি আমার দিকে বিরূপ দৃষ্টিতে তাকায়, তবে বলব ওকে দেখাচ্ছে ভোর বেলার বৃষ্টি ধোয়া টাটকা গোলাপ ফুলের মত। যদি সে মোটেই কথা না বলে, তবে আমি বলব কি চমৎকার তোমার কন্ঠস্বর-কি চমৎকার তোমার ভাষা আর বাক্যবিন্যাস। ও যদি রেগে গিয়ে আমাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলে, তবে আমি দয়া করে এ বাড়িতে আমাকে আমন্ত্রণ করে আনবার জন্য ওকে ধন্যবাদ জানাব। বলব, ও আমাকে এ বাড়িতে থাকতে বলছে এক সপ্তাহের জন্য। ক্যাথারিন যদি আমাকে বিয়ে করতে না চায়, তবে আমি জিজ্ঞেস করব বিয়েটা কবে হচ্ছে? যাক্ ঐ তো ক্যাথারিন আসছে। দেখা যাক ঐ ভয়ঙ্করী বন বেড়ালটিকে আমি বশ করতে পারি কিনা।

দি টেমিং অফ দি শ্রু । The Taming of the Shrew
দি টেমিং অফ দি শ্রু । The Taming of the Shrew


ক্যাথারিন ঘরে ঢুকল।

পেক্রুশিও বলল, সুপ্রভাত কেট। শুনেছি ওটাই নাকি তোমার নাম।

তার সম্ভাষণ ক্যাথারিণের মোটেই ভাল লাগল না। সে সগর্বে বলল, যারা আমার সঙ্গে কথা বলে

তারা আমাকে ক্যাথারিন বলেই জানে।

তুমি মিছে কথা বলছ, এক গাল হেসে পেক্রশিও বলল, তোমাকে কেট বলেই ডাকা হয়। সুন্দরী কেট। অবশ্য মাঝে মাঝে তোমাকে উগ্রচণ্ডা কেটও বলে কেউ কেউ। তুমি নাকি দারুণ দজ্জাল-দারুণ ঝগড়াটে। কিন্তু যে যাই বলুক না কেন আমার কাছে তুমি সুন্দরী কেট। দুনিয়ার সেরা সুন্দরী। তোমার ভদ্র আচার-আচরণের কথা সব জায়গাতেই শুনতে পাওয়া যায়। তোমার রূপ-গুণের কথা শুনেই তো আমি তোমাকে বিয়ে করবার জন্য ছুটে এসেছি।

ক্যাথারিন হুংকার দিয়ে উঠল, এসেছ! বেশ, এবার তা হ'লে দূর হয়ে যাও।

ক্যাথারিনের ঝগড়াটে ভঙ্গী দেখে বোঝা গেল যে তার 'দজ্জাল' খেতাবটি খুবই সার্থক।

পেক্রশিও অবাক হবার ভান করে বলল, চলে যাব? তার অর্থ?

-অর্থ তো খুবই সহজ-সরল, তুমি একটা মহানির্বোধ, তাই এই সাধারণ মানেও বুঝতে পারছ না।

-কিন্তু আমি তো এমনি এমনি ফিরে যাবার জন্য আসি নি। আগে বিয়ের ব্যাপারটা পাকা করে নিই, তারপর তো যাব।

ক্যাথারিন আরো রেগে গিয়ে চীৎকার করে উঠল, তোমার মত মানুষকে কি করে সরিয়ে দিতে হয় তা আমি জানি।

এ কথার অর্থ?

-আবার অর্থ! এ লোকটা তো দেখছি আচ্ছা হাঁদা, কোন কথাই বুঝতে পারে না শোন, তুমি হলে একখানা টুলের মত। এক ধাক্কায় তোমার মত টুলকে সরিয়ে দেওয়া যায়।

বাঃ। বাঃ। ভারী চমৎকার কথা বলেছ তো, উল্লাসের সুরে পেক্রশিও বলল, আমি টুল। বেশ... বেশ। তা কেট, আমি যদি টুল হই, তবে তুমি এ টুলখানার উপর বসে পড় না।

তোমার আস্পর্ধা তো কম নয়। তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ জান?

-জানি। বলছি আমার কেট এর সঙ্গে।

-তুমি... তুমি একটা ভারবাহী গাধা।

ক্যাথারিন রাগে ফেটে পড়ল।

ভার তো মেয়েদেরও বইতে হয়। তুমি একটি মেয়ে। অবশ্য তুমি বেশ হালকা।

-তোমার মত মুর্খ আর নির্বোধের কাছেই আমি হালকা। আমারও যেভার আছে তা বুঝবার মত

বুদ্ধি তোমার ঘটে নেই।

-আরে, আরে, তুমি দেখছি সত্যি সত্যিই রেগে গিয়েছ!

-রাগব না। ক্যাথারিন ঝংকার দিয়ে উঠল।

-তুমি একটি বোলতা, পেক্রশিও হেসে বলল।

-মনে রেখো বোলতার হুল থাকে। তুমি হুলের ভয় কর না?

-হুল আমি তুলে ফেলবো।

-হুল কোথায় থাকে জানো?

-কেন জানব না। হুল তো থাকে বোলতার লেজে।

-জিভেও তো থাকতে পারে।

-জিভে থাকবে কি করে? পেক্রশিও প্রশ্ন করল।

-তোমার মত পাগলের জিভে থাকলেও থাকতে পারে।

-না, না, আমি পাগল নই। আমি একজন সম্পূর্ণ সুস্থ ভদ্রলোক।

-ভদ্রলোক! তাই নাকি? এবার তাহলে দূর হও।

-আমি তো বিয়ের কথাটা পাকা না করে যেতে পারছি না।

ক্যাথারিনের মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ে গেল। সে ঠাস্ করে একটা চড় কষিয়ে দিল পেক্রশিওর বালে।

পেক্রশিও চোখ পাকিয়ে বলল, তুমি আমায় চড় মারলে, এবার আমি তোমায় ঘুষি মারব।

-কোন ভদ্রলোক মেয়েদের গায়ে হাত তোলে না।

-কেট, তোমার এ ঝগড়াটাও আমার খুব লাগছে। আমাকে তোমার বর হিসেবে স্বীকার করে নাও না।

-তোমার পরিচয় কি?

-আমি একজন ভদ্রলোক।

-ভদ্রলোক না ছাই। ক্যাথারিন ঝংকার দিয়ে উঠল।

-না না সত্যি বলছি..।

-ঢের হয়েছে। তোমার আর একটি কথাও শুনব না। আমি চললাম।

পেক্রশিও ক্যাথারিনের পথ আটকে বলল, না, না, কেট তুমি চলে যেও না। আমি তোমাকে যেতে দেব না। তোমাকে আমার খুব পছন্দ। তোমার স্বভাবটি কত কোমল! কত সুন্দর! অথচ লোকে বলে তুমি নাকি দজ্জাল ..ঝগড়াটে.... উগ্রচণ্ডা। সব মিথ্যে কথা। এসব অপবাদ নিন্দুকদের রটনা। কেট, তুমি একটু হাঁটবে। আমি তোমার চলার ছন্দটা দেখব।

তাকে যে এমন কথা কেউ বলতে পারে, তা ক্যাথারিন স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি। দারুণ রাগে দিশেহারা হয়ে সে চীৎকার করে উঠল, নির্বোধ। তুমি এক্ষুণি দূর হয়ে যাও এর ঘর থেকে।

পেক্রশিও একগাল হেসে বলল, বাঃ বাঃ। রেগে গেলে তো তোমাকে আরো সুন্দর দেখায় কেট।

ক্যাথারিন আরো রেগে গেল।

পেক্রশিও সুরেলা গলায় বলল, ডায়ানা দেবী বিরাজ করে কুঞ্জবনে, আর আমার সুন্দরী কেট বিরাজ করছেন এই ঘরে। ডায়ানা দেবী তো চঞ্চলা আর কেট কেমন ধীর স্থির।

খোশামোদে কে না খুশী হয়? ক্যাথারিনের রাগটা একটু কমল। সে জিজ্ঞেস করল,

-এরকম কথা কোথা থেকে শিখলে?

-শিখেছি আমার মায়ের কাছ থেকে। ঠিক সময়ে ঠিক কথাটিই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে।

-তোমার মা বুদ্ধিমতী কিন্তু তোমার মগজে একবিন্দু বুদ্ধি নেই।

-কেন? কেন? আমার বুদ্ধি নেই একথা তোমাকে কে বলল? পেক্রশিও প্রশ্ন করল।

-কে আবার বলবে? তোমার আচরণই বলছে।

পেক্রশিও বলল, বাজে কথা থাক। এবার কাজের কথা হোক, শোন কেট, সিনর বাপ্তিস্তা তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে রাজী হয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিয়েতে যৌতুক হিসেবে তিনি বিশ হাজার 'ক্রাউন' দেবেন। আমি তো বিয়ের প্রস্তাব নিয়েই এসেছি। এখন তোমার মত থাক বা না থাক, তোমাকে আমি বিয়ে করবই। আমাকে ছাড়া তুমি আর কাউকে বিয়ে করতেই পারবে না। তুমি যত বড় দজ্জালই হও না কেন, তোমাকে আমি পোষ মানাবই।

বাপ্তিস্তা আর গ্রেমিও ঘরে ঢুকলেন।

সিনর বাপ্তিস্তা বললেন, কি আমার বড় মেয়ের সঙ্গে আলাপ হল?

-হ্যাঁ, হ্যাঁ আপনার মেয়েটি যেমন সুন্দরী তেমনি সুশীলা, এক গাল হেসে পেক্রশিও বলল।

-প্রস্তাব করেছ?

-নিশ্চয়ই। আপনার মেয়ে তো এক কথায় রাজী। আমাকে দেখেই তার পছন্দ হয়ে গিয়েছেন।

কি...ই..ই...! ক্যাথারিনের গলা চিরে একটা তীক্ষ্ণ চীৎকার বেরিয়ে এল। মেয়ের দিকে তাকালে

বাপ্তিস্তা।

রাগে ফেটে পড়ে ক্যাথারিন বলল, বাবা, কোথা থেকে এই মুর্খ আর পাগলটাকে ধরে এনেছ আমার সঙ্গে বিয়ে দেবার জন্য! আর কি কোন পাত্র জুটল না? দেশে কি ভাল পাত্রের আকাল হয়েছে?

সিনর বাপ্তিস্তা হতবুদ্ধি হয়ে তাকালেন পেক্রশিওর দিকে।

পেক্রশিও বলল, ওর কথা শুনে ভুল করবেন না। এ রাগটা হল আসলে ভান। আমি বিয়ের প্রস্তাব করেছি। ও রাজী হয়েছে। আমাদের মধ্যে কথাবার্তা একেবারে পাকা হয়ে গিয়েছে। আগামী রবিবারেই বিয়ে হবে।

ক্যাথারিন রেগে গিয়ে চীৎকার করে উঠল, আগামী রবিবারে তুমি ফাঁসিতে ঝুলবে।

বাঃ বাঃ। হবু বর সম্পর্কে হবু কনের কি চমৎকার সদিচ্ছা। এই বুঝি কথাবার্তা পাকা হয়ে যাবার

নমুনা? গ্রেমিও ব্যঙ্গের সুরে প্রশ্ন করল।

-আপনি আমাদের ব্যাপারে কোন মন্তব্য না করলেই খুশী হব, গ্রেমিওর দিকে তাকিয়ে পেক্রশিও বলল, আমাকে উদ্দেশ্য করে সে বলল, আমাদের দু'জনের মধ্যে আলাপ আলোচনা হয়ে গিয়েছে। বিয়ের দিন-ক্ষণও দেখে ঠিক হয়ে গিয়েছে। সিনর বাপ্তিস্তা, আপনি চিন্তা করবেন না। আপনার মেয়ে অন্যের সামনে মুখরা এবং দজ্জালের মত আচরণ করলেও যখন একা আমার কাছে ছিল তখন কিন্তু খুব ভাল এবং ভদ্র আচরণই করছি।

বাপ্তিস্তা বললেন, তাই করলেই ভাল।

পেক্রশিও বলল, সিনর বাপ্তিস্তা, আপনি বিয়ের যোগাড়-যন্তর করুন। বড় মেয়ের বিয়ে। ভোজের আয়োজনটা নিশ্চয়ই ভাল করে করবেন। এখন আমি যাচ্ছি। বিয়ের জিনিষপত্তর আর পোষাক-পরিচ্ছদ কিনবার জন্যে আমাকে আবার ভেনিসে ছুটতে হবে। আগামী রবিবারে বিয়ে। হাতে তো আর সময় নেই।

বাপ্তিস্তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পেক্রশিও চলে গেল।

আর এদিকে বিয়াংকাকে বিয়ে করবার জন্য দুই ছদ্মবেশী শিক্ষক লুনেসিও আর হর্তেনসিওর মধ্যে শুরু হল জোর প্রতিযোগিতা। দু'জনেই শিক্ষার মধ্য দিয়ে তরুণী বিয়াংকাকে নিজেদের মনের কথা জানাতে শুরু করল।

_________________________________________________

নাটকের নামঃ দি টেমিং অফ দি শ্রু
লেখকঃ উইলিয়াম শেক্সপিয়ার 
(বাংলা ভার্ষণ)

পর্ব- ০৪ (অদ্ভুত বিয়ে)

রবিবার এল। ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। অতিথিরা অপেক্ষা করে আছেন। কিন্তু কোথায় পেক্রশিও? তার তো টিকিটি দেখা যাচ্ছে না। সে এলে তবেই তো সবাই গীর্জার দিকে রওনা দিতে পারে।

নিমন্ত্রিত অতিথিরা অপেক্ষা করে করে অধৈর্য হয়ে পড়রেন। তাঁরা বাঁকা বাঁকা কথা শোনাতে শুরু করলেন। যে পাদ্রীঠাকুর বিয়ে দেবেন তিনিও ধৈর্য হারিয়ে ফেললেন। সিনর বাপ্তিস্তা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। তাঁর ভয় হল অতিথিদের সামনে তিনি হয়ত অপদস্থ হবেন। রাগে, অপমানে ক্যাথারিন কাঁদতে লাগলেন। লোকটা তাকে নিয়ে এরকম বিদঘুটে রসিকতা করল!

বহুক্ষণ অপেক্ষা করবার পর পেক্রশিও এল। কিন্তু কনের জন্য যে জমকালো পোষাক-পরিচ্ছদ সে আনবে বলেছিল, তার কিছুই সে আনেনি। সে নিজেও সেজে এসেছে অদ্ভুত পোশাক। তাকে বিয়ের বর বলে মনেই হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল কোথা থেকে যেন একটা পাগল এসেছে। তার সঙ্গে কোন বরযাত্রী নেই। আছে কেবল একটি চাকর। তাকেও দেখাচ্ছিল একটা ভিখারীর মত। যে দু'টো ঘোড়ায় চেপে ওরা এসেছে সে দু'টো একেবারে অস্থিচর্মসার, দেখলেই মনে হয় ঘোড়া দু'টো অনেকদিন পেটপুরে খেতে পায়নি।

বাপ্তিস্তা বললেন, তোমার ঐ পোশাক ছেড়ে ফেল। আজ তোমার বিয়ে। বিয়ের দিনে ও পোশাক মানায় না, তুমি বরের সাজ পর।

পেক্রশিও কিন্তু কিছুতেই পোশাক বদলাতে রাজী হল না, বরং অদ্ভুত ভাবে হেসে বলল, কেট তো আমার পোশাককে বিয়ে করছে না-বিয়ে করছে আমাকে।

কিছুতেই যখন পেক্রুশিওর মত পালটানো গেল না তখন সবাই হাল ছেড়ে দিল, কি আর করা যাবে। যাক, বিয়েটা তো হয়ে যাক।

বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য সবাই গীর্জায় চলল। সেখানে গিয়ে পেক্রশিও বদ্ধ উন্মাদের মত আচরণ শুরু করল।

পুরোহিত ক্যাথারিনকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি পেক্রশিওর পত্নী হতে সম্মত আছে?

ক্যাথারিন কোন উত্তর দেবার আগেই পেক্রশিও চীৎকার করে বলে উঠল, হ্যাঁ, হ্যাঁ খুব সম্মত আছে। আনন্দের সঙ্গেই সম্মত আছে।

সে এমন জোরে চীৎকার করে উঠল যে পাদ্রীঠাকুর আঁতকে উঠলেন। তাঁর হাত থেকে বিয়ের পুঁথিখানা খসে পড়ে গেল গীর্জার মেঝেতে। তিনি নীচু হয়ে পুঁথি তুলতে যেতেই পেক্রশিও তাঁকে একটা ধাক্কা মারল। পাদ্রী ঠাকুর ভারসাম্য হারিয়ে হুড়মুড় করে পড়ে গেলেন।

যাই হোক পাদ্রীমশাই আবার পুঁথি নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। যতক্ষণ বিয়ে অনুষ্ঠান চলল ততক্ষণ পেক্রশিও পা দাপাতে লাগল-চীৎকার করতে লাগল আর ক্রমাগত গালাগালি দিয়ে চলল। ক্যাথারিন ভয়ে থর থর করে কাঁপতে শুরু করল। জীবনে এই বোধ হয় সে প্রথম ভয় পেল।

এরই মধ্যে কোন রকমে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হল।

অনুষ্ঠান শেষ হতে নতুন বর উপস্থিত সবাইকার স্বাস্থ্যপান করবার জন্য মদ আনবার হুকুম দিল। তারপর গীর্জার ভিতরেই মদ খেয়ে পানপাত্রের তলানিটুকু ছুঁড়ে দিল পাশে দাঁড়ানো লোকটির মুখের উপর। বলল বন্ধু, তোমার দাড়িটা বড় পাতলা। মনে হচ্ছে তোমার দাড়ির খুব ক্ষিধে পেয়েছে। ঘন দাড়ির জন্য দরকার মদের সার। আজকের এই শুভ দিনে তোমাকে একটু সার দিলাম।

বিয়ের মিছিল গীর্জা ছেড়ে বেরিয়ে এল। মিছিলের সামনে অদ্ভুত বর আর ভয়ে কাঁপা কনে। শহরের নানা রাস্তা অতিক্রম করে মিছিল এগিয়ে চলল সিনর বাপ্তিস্তার প্রাসাদের দিকে। সারাটা পথ ধরে পেত্রক্রশিও পাগলের মত হাসতে লাগল-চীৎকার করতে লাগল। স্বামীর অদ্ভুত আচরণে ক্যাথারিনের মাথাটা লজ্জায় হেঁট হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত মিছিলটা পৌঁছে গেল সিনর বাপ্তিস্তার প্রাসাদে।

বড় মেয়ের বিয়েতে বাপ্তিস্তা একটা বিরাট ভোজের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু পেক্রশিও অতিথিদের লক্ষ্য করে বলল, আপনারা খাওয়া দাওয়া করুন। আমি খাব না। আমার আর এক মুহূর্ত এখানে অপেক্ষা করলে চলবে না। আমাকে এক্ষুণি চলে যেতে হবে। বাড়িতে খুব জরুরী কাজ রয়েছে। কেটও আমার সঙ্গে এক্ষুণি চলে যাবে।

অতিথিরা গুঞ্জন শুরু করলেন। ও মা, এ আবার কোন্ দেশী ব্যাপার। বিয়ের ভোজে বর কনে কেউ উপস্থিত থাকবে না।

বিয়ের ভোজে বর কনেকে সঙ্গে নিয়ে অতিথিরা খেতে বসবেন-এটাই তো নিয়ম। ওরাই যদি উপস্থিত না থাকে তবে সে ভোজের আনন্দ কোথায়? মূল্য কোথায়?

বয়স্করা পেক্রশিওকে বুঝাতে লাগলেন। কিন্তু তার ঐ এক কথা আমাকে এক্ষুণি চলে যেতে হবে। কেটও যাবে আমার সঙ্গে।

নিজের বিয়ের ভোজে থাকতে পারবে না শুনে ক্যাথারিন খুব রেগে গেল। সে চীৎকার করে পেক্রশিওকে বকতে লাগল, কিন্তু সে বকুনিতে পেক্রশিও মোটেই কান দিল না। সে বরং মিষ্টি কথায় তুষ্ট করবার চেষ্টা করতে লাগল নতুন বৌকে।

বাপ্তিস্তা এবং নিমন্ত্রিত অতিথিরা ও ক্যাথারিনকে স্বামীর সঙ্গে যাবার জন্যই উপদেশ দিলেন। কারণ বিয়ে যখন হয়েই গিয়েছে তখন স্বামীর সঙ্গে না গেলে সেটা খুবই নিন্দার বিষয় হবে। অগত্যা নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও ক্যাথারিনকে রাজী হতে হল।

পেক্রশিও খুশী হয়ে চাকরকে তিনটে ঘোড়া তৈরী করবার জন্য আদেশ দিল।

ঘোড়া! হ্যাঁ ওগুলো ঘোড়াই। কিন্তু হাড় আর চামড়া ছাড়া ওদের শরীরে আর কিছুই নেই।

এরকম একটা হাড়সর্বস্ব ঘোড়ায় ক্যাথারিনকে বসিয়ে পেক্রশিও এবং তার চাকর একই রকমের আর দু'টো ঘোড়ায় চেপে বসল। তারপর এবড়োখেবড়ো কাদায় ভরা পথ ধরে সেই বিচিত্র বাহন তিনটি খুট খুট্ করে এগিয়ে চলল। পেক্রশিও ঘোড়া তিনটেকে অভিশম্পাত করতে লাগল। চীৎকার করে জোরে ছুটবার ইঙ্গিত করতে লাগল কিন্তু, জোরে ছুটবে কি করে? বেচারা পশু তিনটেকে দেখে মনে হচ্ছিল যে কোন মুহূর্তে বোঝার ভারে প্রাণ হারিয়ে ওরা মাটিতে লুটিয়ে পড়তে পারে।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url