দি টেমিং অফ দি শ্রু। উইলিয়াম শেক্সপিয়ার। The Taming of the Shrew
বাপ্তিস্তার বাড়িতে ওরা সবাই পৌঁছে গেল। সম্ভাষণের পালা শেষ হতে পেক্রশিও বাপ্তিস্তার দিকে তাকিয়ে বলল, শুনেছি আপনার বড় মেয়ে ক্যাথারিন খুব সুন্দরী; তার স্বভাবও নাকি খুব নম্র আর্দ্র।
বাপ্তিস্তা বললেন, হ্যাঁ, আমার বড়মেয়েটির নাম ক্যাথারিন। পেক্রুশিও বলল, আমার বাড়ী ভেরোনা শহরে। ক্যাথারিনের রূপ-গুণের কথা শুনে আমি আপনার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। আমার এই অনুচরটির নাম লিশিও। এ লোকটি ভাল গান জানে। তাছাড়া অঙ্ক আর বিজ্ঞানে এর অসাধারণ দক্ষতা। শুনেছি আপনার ছোট মেয়ে বিয়াংকার জন্য আপনি একজন গৃহশিক্ষক খুঁজছেন। তাই ওকে নিয়ে এলাম আপনার কাছে। মনে হয় গৃহশিক্ষক হিসেবে লিশিওকে নিযুক্ত করলে আপনি ঠকবেন না।
-বেশ বেশ। আমি শিক্ষক লিশিওকে আমার গৃহে স্বাগত জানাচ্ছি। কিন্তু আপনি তো আমার বড় মেয়েকে বিয়ে করতে পারবেন না।
![]() |
দি টেমিং অফ দি শ্রু | The Taming of the Shrew |
-ভুরু কুঁচকে পেক্রশিও বলল, কেন? পাত্র হিসেবে কি আমি অযোগ্য? নাকি আপনিই মেয়ের বিয়ে দিতে চান না?
-না না এর কোনটাই নয়। আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না।
-বেশ ভুল বুঝলাম না, পেক্রশিও বলল।
-আপনার নামটি কি? বাপ্তিস্তা জিজ্ঞেস করলেন।
-পেক্রশিও।
-পরিচয়?
-আগেই বলেছি আমার বাড়ী ভেরোনা শহরে। আমার বাবার নাম আন্তোনিও।
-তাই নাকি। তাঁকে তো আমি চিনি। তাঁর অগাধ সম্পত্তি। রীতিমত খানদানী মানুষ তিনি তাঁর ছেলে তো আমার স্নেহের পাত্র। সে ছেলের জন্য আমার ঘরের দরজা সবময়ই খোলা। তা, কেমন আছেন সিনর আন্তোনিও?
-তিনি সম্প্রতি মারা গিয়েছেন। তাঁর সমস্ত সম্পত্তির মালিক হয়েছি আমি।
এবার গ্রেমিও ছদ্মবেশী লুসেনসিওকে দেখিয়ে বলল, আপনি বিয়াংকার জন্য একজন ভাল শিক্ষক দেখতে বলেছিলেন, তাই এ ভদ্রলোককে নিয়ে এসেছি। এর নাম ক্যাম্বিও। ইনি খুব পণ্ডিত গ্রীক, লাতিন এবং আরো অনেক ভাষা জানেন উনি। তাছাড়া গান-বাজনায়ও ওঁর অসাধারণ দক্ষতা রয়েছে। আমার মনে হয় এঁকে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করলে বিয়াংকার উপকারই হবে।
বাপ্তিস্তা বললেন, ধন্যবাদ গ্রেমিও। আসুন ক্যাম্বিও। আমার গৃহে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।
এরপর ত্রানিওর দিকে ফিরে বাপ্তিস্তা বললেন, আপনার পরিচয় তো এখনও জানতে পারলাম না। আপনি কি জন্য আমার কাছে এসেছেন তাও জানবার সুযোগ হয়নি এ পর্যন্ত।
ত্রানিও বলল, আমি এ শহরের লোক নই। আমার বাড়ী পিসা নগরে। আপনার ছোট মেয়ের রূপ গুণের কথা শুনে তার পাণিপ্রার্থী হয়ে এসেছি আমি।
-কিন্তু আমি তো বড় মেয়ের বিয়ে না দিয়ে ছোটর বিয়ের কথা ভাববই না। এ আমার প্রতিজ্ঞা। -আপনার এই প্রতিজ্ঞার কথা আমি শুনেছি। আমার বংশ পরিচয় দিলে আপনি বোধহয় আমাকে নিতান্ত অযোগ্যপাত্র বলে মনে করবেন না। শুনেছি আপনার ছোট মেয়ে পড়াশুনা করতে চায়, গান বাজনা শিখতে চায়। তার জন্য এই কখানি মূল্যবান গ্রীক আর লাতিন পুঁথি নিয়ে এসেছি। তাছাড়া এনেছি এই বীণাখানি। আপনার ছোট মেয়ে আমার এই সামান্য উপহারটুকু গ্রহণ করলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব। এবার আমার পরিচয় দিচ্ছি! আমার নাম লুসেনসিও। আমার বাবার নাম ভিনসেনসিও।
হ্যাঁ হ্যাঁ, তাঁর নাম আমি শুনেছি, বাপ্তিস্তা বললেন, তিনি তো একজন ধনী আর মানী বণিক। আপনাকে আমার কুটিরে স্বাগত জানাচ্ছি।
বিয়ের প্রস্তাবটা করবার জন্যই ত্রানিও এখানে এসেছিল। তা যখন করা হয়ে গেল তখন আর অপেক্ষা করবার প্রয়োজন কি? বরং অপেক্ষা করলে হয়ত আলাপ করতে করতে মুখ দিয়ে কোন বেফাঁস কথা বেরিয়ে পড়বে। সিনর বাপ্তিস্তার মনে হয়ত সন্দেহ জেগে উঠবে। সুতরাং সে বলল, আজকে আমি উঠি আমার একটু জরুরী কাজ রয়েছে। পরে আবার দেখা করব।
ত্রানিও বিয়ান্দেলোকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেল। তারপর গ্রেমিও বিদায় নিল বাপ্তিস্তার কাছ থেকে।
ঘরে রইলেন বাপ্তিস্তা আর পেক্রুশিও।
বড় মেয়ে ক্যাথারিনকে বিয়ে করবার জন্য পাত্র এসেছে। সিনর বাপ্তিস্তার মনটা খুশিতে ভরা।
কিন্তু তিনি একজন সৎ মানুষ। ক্যাথারিনের স্বভাৰ চরিত্র সম্পর্কে হবুপাত্রকে সব কথা খুলে বলা উচিত। সত্য গোপন করে তিনি কাউকে ঠকাতে চান না। তাই তিনি বললেন, ক্যাথারিনের আচার-আচরণ যে সব সময় ভদ্র আর মনোরম থাকে তা নয়। মাঝে মাঝে....
কথা শেষ করতে পারলেন না বাপ্তিস্তা। অন্দরমহল থেকে ছুটে বেরিয়ে এল মেয়েদের নতুন সঙ্গীত শিক্ষক। এ শিক্ষক হল ছদ্মবেশী হর্তেনসিও। হর্তেনসিওর মাথায় আঘাত লেগেছে।
বাপ্তিস্তা ব্যস্ত হয়ে বলেন, ব্যাপার কি? কি হল আপনার?
আর ব্যাপার! আপনার মেয়ে ঝগড়টাটে, সে দজ্জাল-এটাই শুনেছিলাম। কিন্তু সে যে এমন ভয়ঙ্কর মারকুটে তা তো শুনি নি? দেখুন না, আমার মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে।
বাপ্তিস্তা' বিব্রত হয়ে বললেন, কি সর্বনাশ! সত্যিইতো... মাথা ফেটে সত্যি সত্যিই তো রক্ত পড়ছে। এটা কি করে হল?
আপনার কন্যা রত্নটি বেহালা দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করেছে।
-কেন? কেন? সে হঠাৎ এতটা রেগে গেল কেন?
শিক্ষক বেশী হর্তেনসিও বলল, বেহালা বাজানো শিখাচ্ছিলাম। বাজাতে গিয়ে ক্যাথারিন বার বার ভুল করছিল। তাই তার হাত ধরে শেখাতে গিয়েছিলাম। ব্যস! দারুণ রেগে গেল আপনার মেয়ে। বেহালাটা দিয়ে ধাঁই করে আমার মাথায় এক ঘা বসিয়ে দিল। ছাত্রীর হাতে মার খেয়ে আমি হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম আপনার বড়মেয়ের দিকে। শ্রীমতী ভয়ঙ্করী আমাকে কম করে কুড়িটা বাছা বাছা গালাগালি দিল।
পেক্রশিও বলল, বাঃ কি চমৎকার মেয়ে। আমি তো ওকে আগের চাইতে অনেক বেশী ভালবেসে ফেললাম।
বড়মেয়ের দজ্জাল স্বভাবের কথা ভাল করেই জানা আছে বাপ্তিস্তার। স্বভাবের জন্য মেয়ে সুন্দরী হলেও তার জন্য পাত্র পাওয়া যাচ্ছিল না। এখন একটি সৎপাত্র নিজে যেচে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। কিন্তু ব্যাপারস্যাপার দেখে সে আবার মত পাল্টে কেটে না পড়ে। কাজেই প্রসঙ্গটাকে পাল্টাবার জন্য তিনি শিল্পী বেশী হর্তেনসিওকে বললেন, ঠিক আছে, ক্যাথারিনকে আর বাজনা শেখানোর দরকার নেই। আপনি বরং আমার ছোট মেয়ে বিয়াংকাকে গান বাজনা শেখান।
দেখা গেল গানের শিক্ষকের তাতে একটুও আপত্তি নেই। সে ভাঙা বেহালাটা নিয়েই বাড়ীর মধ্যে ঢুকে গেল। বিয়াংকার কাছে যাবার সুযোগ পাওয়া গিয়েছে এ সুযোগ কি হারানো যায়? ভিতরে গিয়ে ছদ্মবেশী হর্তেনসিও দেখল আর একজন শিক্ষক কাব্য পড়াচ্ছেন বিয়াংকাকে।
পেক্রশিও বলল, সিনর বাপ্তিস্তা, আপনার মেয়েকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমি বিয়েটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে চাইছি। বলুন, আপনার মেয়ে যৌতুক হিসেবে কত টাকা পাবে?
তরুণ পাত্রটির এই তাড়াহুড়ো বাপ্তিস্তার পছন্দ হল না। কিন্তু ক্যাথারিনের জন্য একটি পাত্র যোগাড় করতে সিনর বাপ্তিস্তা ব্যগ্র হয়ে উঠেছিলেন। পাত্র নিজে যেচে এসেছে। এ সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইলেন না তিনি। কাজেই নিজের অপছন্দটা মনেই চেপে রেখে পেক্রশিওর প্রশ্নের উত্তরে বাপ্তিস্তা বললেন, যৌতুক হিসেবে আমি মেয়েকে বিশ হাজার ক্রাউন দিচ্ছি। আমার মৃত্যুর পর সে আমার সম্পত্তির অর্ধেক অংশ পাবে।
শুনে পেক্রশিও খুব খুশী হল। বাপ্তিস্তা বললেন, তাহলে বাড়ীর ভিতরে চল। আমার মেয়ের সঙ্গে তোমাকে পরিচয় করিয়ে দিই।
তিনি পেক্রশিওকে তুমি বলেই সম্বোধন করলেন এবার। হবু জামাইকে কি আর আপনি আজ্ঞে করা যায়!
পেক্রশিও বলল, না আমি এখন অন্দরমহলে যাব না, আপনার বড় মেয়েকে এখানেই পাঠিয়ে দিন।
-বেশ, তাই দিচ্ছি।
বাপ্তিস্তা বাড়ীর মধ্যে চলে গেলেন। পেক্রশিও একা বসে রইল।