গুপ্তযুগে বাংলার ইতিহাস
কুষাণ ও অন্ধ্র রাজের পতনের পর কিছু সময়ের জন্য ভারতে কোন ধরনের রাজনৈতিক শক্তি ছিল না। প্রায় এক শতাব্দী যাবৎ ভারতবর্ষ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ভারতের এই পরিস্থিতিতে (খ্রীস্টায় তৃতীয়-চতুর্থ শতকে) শুপ্ত বংশের উত্থান হয়। এই বংশের প্রথম ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন শ্রীগুপ্ত। শ্রীগুপ্ত ও তাঁর পুত্র ঘটোৎকচ সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে ঘটোৎকচের পুত্র চন্দ্রগুপ্ত এবং তাঁর পুত্র সমুদ্রগুপ্ত ও পৌত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বাংলা সহ ভারতে একটা বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
গুপ্তদের আদি বাসস্থান সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মত পার্থক্য আছে। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে গুপ্তদের আদি বাসস্থান ছিল মগধে। চৈনিক পরিব্রাজক ইৎ-সিং এর বিবরণ অনুযায়ী মহারাজ শ্রীগুপ্ত চীন দেশীয় শ্রমণদের জন্য মৃগস্থাপন স্তুপের নিকট একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। শ্রী সুধাকর চট্টোপাধ্যায় ঐ মন্দিরের অবস্থান নির্ণয় করতে গিয়ে বলেন ঐ মন্দির ছিল মালদহের নিকটে। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে প্রাপ্ত একখানা বৌদ্ধ পাণ্ডুলিপি হতে জানা যায় যে, মৃগস্থাপন স্তুপ বরেন্দ্রে অবস্থিত ছিল। এইসব মতবাদের উপর ভিত্তি করে ডি.সি. গাঙ্গুলী উপসংহারে পৌছেন যে, গুপ্তদের আদি বাসস্থান ছিল বাংলাদেশে।
![]() |
| গুপ্তযুগে বাংলার ইতিহাস |
বাংলায় গুপ্তদের আধিপত্য বিস্তারের প্রাথমিক কাল নির্ণয়ে যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়েছে। প্রথম চন্দ্রগুপ্ত যখন বিশাল গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন তখন বাংলায় কতকগুলো স্বাধীন রাজ্য ছিল। বাঁকুড়ার নিকটবর্তী শুশুনিয়ার নামক স্থানে পর্বতগাত্রে ক্ষোদিত এক লিপিতে পুস্করণের অধিপতি সিংহবর্মা ও তাঁর পুত্র চন্দ্রবর্মার উল্লেখ আছে। শুশুনিয়ার নিকটবর্তী দামোদর নদের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত পোখর্ণা নামক গ্রামই এই রাজবংশের রাজধানী পুস্করণ বলে অনুমান করা হয়। চন্দ্রবর্মার রাজ্য কতদুর বিস্তৃত ছিল, তা সঠিকভাবে বলা যায় না। ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়ায় চন্দ্রবর্মকোট নামক একটা দুর্গ ছিল। ষষ্ট শতকের শিলালিপিতে এর উল্লেখ আছে। অনেকের মতে, উল্লেখিত চন্দ্রবর্মার নাম অনুসারে এই দুর্গের ঐরূপ নামকরণ হয়েছিল। এই মত অনুসারে চন্দ্রবর্মার রাজ্য বাঁকুড়া হতে ফরিদপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পুস্করণাধিপ চন্দ্রবর্মাই খুব সম্ভবত: এলাহাবাদ প্রশস্তিতে উল্লেখিত সমুদ্রগুপ্ত কর্তৃক পরাজিত চন্দ্রবর্মা।
দিল্লীর নিকটবর্তী কুতুবমিনার সংলগ্ন একটি লৌহস্তম্ভ আছে। স্তম্ভগাত্রে ক্ষোদিত লিপি হতে জানা যায় যে, চন্দ্র নামক একজন রাজা বঙ্গের সম্মিলিত রাজশক্তিকে পরাজিত করেছিলেন। স্তম্ভলিপিতে উল্লেখিত এই চন্দ্র কে এ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। ঐতিহাসিকগণ তাঁকে গুপ্তবংশীয় রাজা প্রথম চন্দ্রগুপ্ত বা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বলে সনাক্ত করে থাকে। প্রথমোক্ত অনুমান স্বীকার করলে বলতে হয় সমুদ্রগুপ্তের পূর্বেই তাঁর পিতা প্রথম চন্দ্রগুপ্ত বঙ্গদেশ জয় করেছিলেন। যদি দ্বিতীয় অনুমান ঠিক হয় তা হলে মনে করতে হবে যে সমুদ্রগুপ্তের বঙ্গ জয়ের পরও তার পুত্রকে (দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত) বঙ্গ পুনর্জয় করতে হয়েছিল। তবে স্তম্ভ লিপির রাজা চন্দ্রকে সঠিকভাবে সনাক্ত করার কোন ইঙ্গিতই ঐ লিপিতে নেই। কোন কোন পণ্ডিত তাকে শুশুনিয়া লিপিতে উল্লেখিত চন্দ্রবর্মা বলে মনে করেন। যদি এই অনুমান ঠিক হয় তা হলে মনে করতে হবে যে, পশ্চিম বাংলার রাজা চন্দ্রবর্মা বঙ্গের সম্মিলিত শক্তিকে পরাস্থ করে সমুদ্রগুপ্তের বিজয়ের পথ সুগম করেছিলেন। কিন্তু রাজা চন্দ্র যিনিই হন, দিল্লীর স্তম্ভলিপি হতে প্রমাণিত হয় যে, গুপ্তযুগের প্রাক্কালে বঙ্গে একাধিক স্বাধীন রাজ্য ছিল এবং আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে তারা সম্মিলিত হয়ে বিদেশী শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত।
যাহোক, বাংলায় অধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে গুপ্ত রাজাদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় আমরা দিতে না পারলেও সমুদ্রগুপ্ত যে বালাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল গুপ্ত সাম্রাজ্যভুক্ত করেছিলেন সে বিষয়ে নিশ্চিত বলা যায়। সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তিতে তাঁর রাজ্যজয়ের যে বিবরণ রয়েছে তা হতে এই সিদ্ধান্ত করা সম্ভব। উত্তর ভারতে যে সমস্ত রাজাকে তিনি পরাস্থ করেছিলেন তার মধ্যে চন্দ্রবর্মার নাম রয়েছে। এই চন্দ্রবর্মাকে শুশুনিয়া লিপির পুস্করণাধিপ চন্দ্রবর্মা মনে করা হয় এবং তাঁর পরাজয় পশ্চিম ও দক্ষিণ পশ্চিম বাংলায় গুপ্ত শাসনের সূচনা করেছিল বলে মনে হয়। সমুদ্রগুপ্ত যে বাংলাদেশের সমতট ছাড়া অন্য সব জনপদই স্বীয় সাম্রাজ্যভুক্ত করেছিলেন, এলাহাবাদ প্রশস্তি এবং পরবর্তীকালের গুপ্ত তাম্রশাসনসমূহের আলোকে সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
প্রথম কুমারগুপ্তের সময়ের প্রাপ্ত বিভিন্ন তাম্রশাসনসমূহ উত্তর বাংলায় সুনিয়ন্ত্রিত গুপ্ত প্রাদেশিক ব্যবস্থার পরিচয় বহন করে। এই অঞ্চলের গুপ্ত প্রাদেশিক শাসনের কেন্দ্রস্থল ছিল পুণ্ড্রনগর (মহাস্থান)। ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত উত্তর বাংলায় গুপ্ত শাসন অব্যাহত ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় বুধগুপ্তের তাম্রশাসনসমূহে। তাছাড়া সমতট অঞ্চল সমুদ্রগুপ্তের সময় করদরাজ্য হিসেবে থাকলেও পঞ্চম শতাব্দীর শেষের দিকে কোন এক সময়ে গুপ্ত সাম্রাজ্যভুক্ত হয়ে পড়েছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় (৫০৭-০৪ খ্রী. আ.) গুনাইগড় তাম্রশাসনে।
গুপ্তযুগে বাংলায় স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের প্রসার এই সময়ে অব্যাহত থাকলেও গুপ্ত সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই সময়ে হিন্দু ধর্মের উত্থান ও প্রসার ঘটে। বাংলাদেশ এই সময়ে উত্তর ভারতের বৃহত্তর রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সংস্কৃতির ধারার সংগে যুক্ত হয়।
শাসন ব্যবস্থা: গুপ্ত শাসনামলে বাংলার এক বৃহত্তম অংশ গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে ছিল। অপরাপর অংশ সামন্ত রাজারা শাসন করতো। শাসনকার্য পরিচালনায় সামন্ত রাজাদের যথেষ্ট স্বাধীনতা ছিল। কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার অনুকরণে সামন্তরাজগণ নিজেদের এলাকা শাসন করতো। কখনও কখনও তাঁরা 'মহারাজ' উপাধি ধারণ করে স্বাধীনভাবে রাজ্য শাসন করতেন।
বঙ্গ দেশের যে সব স্থান গুপ্তদের প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে ছিল, গুপ্ত সম্রাট সেগুলোকে শাসনকার্যের সুবিধার জন্য কয়েকটি বিভাগে ভাগ করেছিলেন। এসব শাসন বিভাগের নাম ছিল 'ভুক্তি' যেমন- পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তি, বর্ধমানভুক্তি ইত্যাদি। ভুক্তিগুলো আবার 'বিষয়' 'মণ্ডল' 'বীথি' ও 'গ্রামে' বিভক্ত ছিল। সম্রাট ভুক্তির শাসনকর্তা নিযুক্ত করতেন। ভুক্তির প্রশাসককে 'উপরিক' বা 'মহারাজ উপরিক' বলা হত। বিষয়ের শাসনকর্তাকে 'কুমারামাত্য' বা আযুক্তক বলা হত। আবার সময়ে সময়ে বিষয়পত্রি বলা হত। সাধারণত বিষয়পতিগণ ভুক্তির শাসনকর্তা কর্তৃক নিযুক্ত হতেন। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে সম্রাট কর্তৃক সরাসরি নিযুক্তিরও প্রমাণ আছে।
ভুক্তি, বিষয় বা বীথির শাসনকার্য পরিচালিত হত নিজ নিজ শাসন কেন্দ্রে অবস্থিত অধিকরণের মাধ্যমে। অধিকরণ অর্থ সরকারি কার্যালয়। দামোদর তাম্রশাসনে বিষয়ের অধিকরণে বিষয়পতি ছাড়া আরও চারজনের নাম পাওয়া যায়, যথা-নগর শ্রেষ্ঠ, প্রথম সার্থবাহ, প্রথম কুলিক ও প্রথম কায়স্থ। সম্ভবত নগরশ্রেষ্ঠ ছিলেন ধনী মহাজন। প্রথম সার্থবাহ ছিলেন বণিক সম্প্রদায়ের প্রধান, প্রথম কুলিক ছিলেন শিল্পী সম্প্রদায়ের প্রধান। প্রথম কায়স্থ বলতে হয় কায়স্থ শ্রেণীর প্রতিনিধিকে বুঝাত কিংবা বর্তমানকালের মুখ্য সচিবকে বুঝাত। এই চার সদস্য বিশিষ্ট অধিকরণের উপদেষ্টা পরিষদ ও এর কার্য পরিচালনা প্রাচীন বাংলার শাসন পদ্ধতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক। যদিও আমরা এর কার্যকরণ সম্বন্ধে বিস্তারিত কিছুই জানিনা, তবুও মনে হয় যে স্থানীয় প্রশাসনের ক্ষেত্রে জনগণের গভীর সংযোগ ছিল এবং তাদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত সংস্থাই শাসনকার্য পরিচালনা করত। অর্থাৎ স্থানীয় শাসন ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিদের কার্য পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
